রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পবিত্র মক্কা মুকাররামায় ১২ রবিউল আউয়াল সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ হিসাবে পালিত হওয়ার অন্যতম ঐতিহাসিক দলীল

পবিত্র মক্কা মুকাররামায় ১২ রবিউল আউয়াল সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ হিসাবে পালিত হওয়ার ঐতিহাসিক দলীল:

‘আল ইলাম বি আলাম বাইতিল্লাহিল হারাম" হলো মক্কা মোকাররমা ও মাসজিদুল হারামের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি বিখ্যাত আরবি গ্রন্থ। এর রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও মুফতি কুতুব উদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমদ আল-নাহরাওয়ানি আল মাক্কী আল-হানাফি রহমতু্ল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ৯৮৮ হিজরি)। মক্কা শরীফের ঐতিহাসিক তথ্যের সত্যতা ও বিন্যাসের জন্য গবেষকদের কাছে গ্রন্থটি অত্যন্ত সমাদৃত।


উক্ত কিতাবের ১৩০৩ হিজরী/১৮৮৫ খৃষ্টব্দ সময়ের একটি নুসখার ১৯৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে,
* قال ويستجاب الدعاء في مولد النبي صلى الله عليه وسلم وهو موضع مشهور يزار الى الآن ومن لحقه مستجد يصلى فيه ويكون في كل ليلة اثنين فيه جمعية يذكرون الله تعالى ويزار في الليلة الثانية عشر من شهر ربيع الأول فى كل عام فيجتمع الفقهاء والاعيان على نظام المسجد الحرام والقضاة الاربعة بمكة المشرفة بعد صلاة المغرب بالشموع الكثيرة والمفرغات والفوانيس والمشاعل وجميع المشايخ مع طوائفهم بالاعلام الكثيرة ويخرجون من المسجد الى سوق وجميع الليل و يمشون فيه الى محل المولد الشريف بازدحام و يخطب فيه شخص ويدعو للسلطنة الشريفة تم نم يعودون الى المسجد الحرام ويجلسون صفوفا في وسط المسجد من جهة الباب الشريف خلف مقام الشافعية ويقف رئيس زمزم بين يدى ناظر الحرم الشريف والقضاة و يدعو للسلطان ويلبسه الناظر خلعة ويلبس شيخ الفراشين خلعة ثم يؤذن للعشاء و يصلى الناس على عادتهم ثم يشى الفقها مع ناظر الحرم الى الباب الذي يخرج منه من المسجد ثم يتفرقون وهذه من أعظم مواكب ناظر الحرم الشريف بمكة المشرفة ويأتى الناس من البدو والحضر واهل جدة وسكان الأودية في تلك الليلة ويفرحون بها وكيف لا يفرح المؤمنون بليلة ظهر فيها أشرف الانبياء والمرسلين صلى الله عليه وسلم وكيف لا يجعلونه عيدا من أكبر أعيادهم
“ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের স্থানে দোয়া কবুল হয়। এটি এমন একটি প্রসিদ্ধ স্থান, যা এখনো যিয়ারত করা হয়। আর যে ব্যক্তি সেখানে প্রয়োজন নিয়ে আসে, সে সেখানে নামাজ আদায় করে। প্রতি সোমবার রাতে সেখানে একটি মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়; তারা মহান আল্লাহ তাআলার যিকির করে। রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে প্রতি বছর সেখানে বিশেষভাবে লোকজন সমবেত হয়। অতঃপর মক্কা মুকাররমার চারজন কাজি এবং মসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফকিহ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মাগরিবের নামাজের পর একত্রিত হন। তাদের সঙ্গে থাকে প্রচুর মোমবাতি, মোমবাতি রাখার বিভিন্ন পাত্র, ফানুস ও মশাল। এবং সকল মাশায়েখগন তাঁদের নিজ নিজ অনুসারীসহ প্রচুর পতাকা নিয়ে উপস্থিত হন। তারপর উনারা মসজিদুল হারাম থেকে বের হয়ে সারা রাত সেখানে চলতে থাকেন; এভাবে উনারা মিছিল করে মাওলিদ শরিফের স্থানে পৌঁছান। তখন সেখানে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। একজন ব্যক্তি সেখানে খুতবা দেন এবং সুলতানের জন্য দোয়া করেন। এরপর তারা আবার মসজিদুল হারামে ফিরে আসেন। সেখানে উনারা মসজিদের মাঝখানে মাকামে শাফেয়ির পেছনে সারিবদ্ধভাবে বসে।
আর জমজমের প্রধান ব্যক্তি (রঈসু যামযাম) হারাম শরিফের তত্ত্বাবধায়ক ও কাজিদের সামনে দাঁড়ান এবং সুলতানের জন্য দোয়া করেন। তখন হারামের তত্ত্বাবধায়ক উনাকে একটি সম্মানসূচক পোশাক পরিয়ে দেন। এবং শাইখুল-ফাররাশীনদের একটি খিল‘আত পরানো হয়। এরপর এশার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয় এবং লোকেরা তাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এশার নামাজ আদায় করে। তারপর ফকিহগণ হারাম শরিফের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে সেই দরজা পর্যন্ত যান, যে দরজা দিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হন। এরপর সবাই নিজ নিজ পথে চলে যায়। এটি মক্কা মুকাররমায় হারাম শরিফের তত্ত্বাবধায়কের সবচেয়ে বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রাগুলোর অন্যতম।
সেই রাতে গ্রামাঞ্চলের লোকজন, শহরের অধিবাসী, জেদ্দার মানুষ এবং উপত্যকাগুলোর বাসিন্দারা সেখানে এসে সমবেত হয়। তারা এ রাত নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। আর মুমিনরা কীভাবে এমন একটি রাতে আনন্দিত না হয়ে থাকতে পারে যে রাতে সমস্ত নবী ও রাসুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে আগমন হয়েছেন? আর তারা কেন এটিকে তাদের অন্যতম বৃহৎ ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করবে না?
(আল ইলাম বি আলাম বাইতিল্লাহিল হারাম ১৯৬ পৃষ্ঠা)
মক্কা শরীফের সেই সময়ের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায়-
১২ রবিউল আউয়াল শরীফ উপলক্ষে সমগ্র আরবের মানুষ জমায়েত হয়ে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করতেন। চার মাযহাবের কাজী, মক্কা শরীফের ফক্বীহ, উলামায়ে কিরাম, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের তত্বাবধায়নে অত্যান্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হতো। তারা বাতি, মশাল, পতাকা নিয়ে মাগরিবের পর মিছিল নিয়ে বের হতেন। হারাম শরীফের সামনে সকলে সমবেত হয়ে উৎসব পালন করেন। আরব অঞ্চলের আশপাশের সবাই এই মহান অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। তারা এই রাতকে ঈদের রাত মনে করে থাকেন।
শুধু তাই না, মুমিনরা কীভাবে এমন একটি রাতে আনন্দিত না হয়ে থাকতে পারে সেটাও সে যুগে প্রশ্ন করা হয়।
সূতরাং ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হঠাৎ আর্বিভূত কোন আমল না এটা মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র মক্কা শরীফের ঐতিহ্যগত আমল। যারা আজ এই আমল থেকে সরে গেছে তারাই বরং মূলধারা থেকে পিছলে পরে গেছে। ইসলামী তাহযিব তামাদ্দুন থেকে সরে গিয়ে বিদয়াতীদের সংশ্রবে পরে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন