পবিত্র মক্কা শরীফে ১২ রবিউল আউয়াল ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ঐতিহাসিক দলীল:
‘আল-জামি‘উল লাতীফ ফী ফাদলি মাক্কাতা ওয়া আহলিহা ওয়া বিনায়িল বাইতিশ শরীফ’ একটি চমৎকার ঐতিহাসিক গ্রন্থ। লিখেছেন হযরত জামালুদ্দীন মুহাম্মদ জারুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ নূরুদ্দীন ইবনু আবী বকর আলী ইবনু যাহীরা আল কুরাশী আল মাখযূমী আল মাক্কী আল হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ৯৮৬ হিজরি)
ইবনু যাহীরা রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন দশম হিজরি শতকের মক্কা শরীফের একজন হানাফি আলেম, সেই সাথে মক্কা শরীফের ফকিহ ও ইতিহাসবিদ।
দশম হিজরি শতকে পবিত্র মক্কা শরীফে ১২ রবিউল আউয়াল শরীফ উপলক্ষে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমাম পালনার্থে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালিত হতো, সেই সাথে পবিত্র বিলাদত শরীফের স্থান যিয়ারতের একটি প্রকাশ্য রীতি প্রচলিত ছিল তা উনার উপরোক্ত বিখ্যাত কিতাবে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মাতবাআতু ঈসা আল-বাবি আল-হালাবি ওয়া শুরাকাহু থেকে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের প্রকাশিত আল-‘জামি‘উল লাতীফের’ নুসখায় উল্লেখ আছে,
أما المواليد فمنها وهو أجلها مولد سيدنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فتبدأ به وهو بمكة فى المكان المعروف بسوق الليل مشهور بمولد التي صلى الله عليه وسلم ، وكان عقيل بن أبى طالب قد استولى عليه زمن الهجرة ، وفيه وفى غيره أشار صلى الله عليه وسلم بقوله في حجة الوداع وهل ترك لنا عقيل من ظل أو منزل ، ولم يزل بيد عقيل وولده حتى باعه بعضهم من محمد بن يوسف الثقفى أخى الحجاج ، فأدخله في داره التي يقال لها البيضاء ولم يزل كذلك حتى حجت الخيزران أم الخليفتين موسى الهادي العباسي وأخيه هارون الرشيد ، فأخرجته وجعلته مسجدا يصلى فيه ، وكون هذا المكان مولده صلى الله عليه وسلم مشهور متوارث بأثره الخلف عن السالف ، وجرت العادة بمكة فى ليلة الثاني عشر من ربيع الأول في كل عام أن قاضى مكة الشافعى يتهيأ لزيارة هذا المحل الشريف بعد صلاة المغرب فى جمع عظيم منهم الثلاثة القضاة وأكثر الأعيان من الفقهاء والفضاره ، وذوى البيوت فوانيس كثيرة ، وشموع عظيمة وزحام عظيم ، ويدعى فيه للسلطان والأمير مكة ، والقاضي الشافعي بعد تقدم خطبة مناسبة للمقام ، ثم يعود منه الى المسجد الحرام قبيل العشاء ويجلس خلف مقام الخليل عليه السلام بازاء قبة الفراشين ، ويدعو الداعي لمن ذكر آنها بحضور القضاة وأكثر الفقهاء ، ثم يصلون العشاء وينصرفون ، ولم أقف على أول من سن ذلك ، وسألت مؤرخي العصر فلم أجد عندهم علما بذلك .
. ومن فضائل هذا المحل المبارك ما نقله الأزرق عمن كان ساكنا به قبل أن تخرجه الخيزران أنه قال : والله لم يصبنا فيه منذ سكناه لا جائحة ولا حاجة حتى خرجنا منه فاشتد علينا الزمان انتهى بمعناه ،
“আর মাওলিদ বা জন্মস্থানসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো আমাদের সাইয়্যিদুনা রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মস্থান। তাই আমরা তা দিয়েই শুরু করছি। এটি মক্কায় ‘সুকুল-লাইল’ নামে পরিচিত স্থানে অবস্থিত, হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের স্থান হিসেবে প্রসিদ্ধ।
হিজরতের সময় হযরত আকীল ইবনু আবি তালিব রদ্য়িাল্লাহু আনহু এই বাড়িটির মালিকানা গ্রহণ করেছিলেন। বিদায় হজের সময় হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বাড়ি এবং এ ধরনের অন্যান্য সম্পদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন: আকীল আমাদের জন্য কোনো ছায়া বা ঘর রেখে যায়নি। এরপরও বাড়িটি হযরত আকীল রদ্য়িাল্লাহু আনহু ও উনার সন্তানদের মালিকানায় ছিল। পরে উনাদের কেউ এটি হাজ্জাজের ভাই মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ আস-সাকাফীর কাছে বিক্রি করে দেন। তিনি বাড়িটিকে তাঁর নিজের বাড়ির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে নেন; সেই বাড়িটিকে ‘আল-বায়দা’ বলা হতো।
এভাবেই চলতে থাকে। অবশেষে দুই আব্বাসীয় খলিফা মূসা আল-হাদী ও তাঁর ভাই হারূন আর-রশীদের মা খায়যুরান রহমতুল্লাহি আলাইহা যখন হজ করতে আসেন, তখন তিনি সেই স্থানটি আলাদা করে বের করে নেন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেখানে নামাজ পড়া হতো। আর এই স্থানটি যে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের স্থান এটি একটি প্রসিদ্ধ ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিষয়; পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে এর ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে এসেছে।
প্রতি বছর ১২ রবীউল আউয়াল শরীফ রাতে পবিত্র মক্কা শরীফে এ রীতি প্রচলিত ছিল যে, মক্কা শরীফের শাফেয়ি কাযী মাগরিবের নামাজের পর এই পবিত্র স্থানটি (হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মস্থান) জিয়ারতের জন্য প্রস্তুত হতেন। উনার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক লোক থাকত, তাদের মধ্যে তিনজন কাযী, ফকিহদের অধিকাংশ বিশিষ্ট ব্যক্তি, অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনও থাকতেন। তাদের সঙ্গে থাকত অসংখ্য ফানুস ও বড় বড় মশাল এবং প্রচণ্ড জনসমাগম হতো।
সেখানে প্রথমে পবিত্র স্থানের মর্যাদা ও উপলক্ষের উপযোগী একটি খুতবা দেওয়ার পর সুলতান ও মক্কা শরীফের আমীরের জন্য দোয়া করা হতো। এরপর তিনি সেখান থেকে ফিরে ইশার নামাজের কিছুক্ষণ আগে মসজিদুল হারামে আসতেন এবং মাকামে খলীল (আলাইহিস সালাম) এর পেছনে, ‘কুব্বাতুল-ফাররাশীন’এর সম্মুখে বসতেন। সেখানে উপস্থিত কাযী ও অধিকাংশ ফকিহদের উপস্থিতিতে সেই ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করা হতো, যাদের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর উনারা এশার নামাজ আদায় করে চলে যেতেন। তবে এই রীতিটি সর্বপ্রথম কে প্রচলন করেছিলেন এ বিষয়ে আমি কোনো তথ্য পাইনি। আমি সে যুগের ইতিহাসবিদদেরও জিজ্ঞাসা করেছি, কিন্তু তাদের কাছেও এ ব্যাপারে কোনো তথ্য পাইনি।
এই বরকতময় স্থানের অন্যতম ফযীলত সম্পর্কে আল-আযরাকী এমন এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যিনি খায়যুরান তাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়ার পূর্বে ঐ স্থানে বসবাস করতেন। তিনি বলেছিলেন: ‘আল্লাহর কসম! আমরা এখানে বসবাস শুরু করার পর থেকে কোনো দুর্যোগ বা অভাব আমাদের স্পর্শ করেনি। কিন্তু যখন আমরা এখান থেকে বের হয়ে গেলাম, তখন আমাদের ওপর সময় কঠিন হয়ে গেল।’
(আল-জামি‘উল-লাতীফ ফী ফাদলি মাক্কাতা ওয়া আহলিহা ওয়া বিনায়িল-বাইতিশ-শরীফ ৩২৫-৩২৬ পৃষ্ঠা)
উপরোক্ত ঐতিহাসিক বিবরন থেকে স্পষ্ট প্রতিয়মান হলো-
পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল শরীফ পবিত্র বিলাদত শরীফের স্থান যিয়ারত করা হতো। এই অনুষ্ঠানে মক্কা শরীফের বিভিন্ন ফকীহ, কাজী, আলেম উলামাদের উপস্থিতিতে মশাল জ্বালিয়ে জুলুস করা হতো। সম্মানিত কাযী ও অধিকাংশ ফকিহদের উপস্থিতিতে দোয়া করা হতো। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন কোন আমল ছিলো না,জাতীয়ভাবে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র পবিত্র মক্কা শরীফে ১২ রবিউল আউয়াল ঈদে মীলাদুন্নবী পালিত হতো।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা লেখক এনেছেন তা ব্যাখ্যা না করলেই না। তিনি বলেছেন-‘তবে এই রীতিটি সর্বপ্রথম কে প্রচলন করেছিলেন এ বিষয়ে আমি কোনো তথ্য পাইনি। আমি সে যুগের ইতিহাসবিদদেরও জিজ্ঞাসা করেছি, কিন্তু তাদের কাছেও এ ব্যাপারে কোনো তথ্য পাইনি।’
প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী কিতাবের লেখক ইবনু যাহীরা রহমতুল্লাহি আলাইহি ৯শত হিজরী শতকের গোড়ায় এই কথা বলতেছেন। তারমানে উপরোক্ত আমল হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোন আমল না। অর্থাৎ মক্কা শরীফে যুগে যুগে আবহমান কাল ধরে চলে আসা প্রাচীন এই আমল। এ কারনে তিনি বলেছেন এই রীতি সর্বপ্রথম কে প্রর্বতন করেছেন তিনি তথ্য পাচ্ছেন না।
আমার গবেষনামতে এই কাইফিয়াতটা খলীফা হারুনুর রশীদের মা খায়জুরান যখন বিলাদত শরীফে স্থানটি যিয়ারতের ব্যবস্থা করে দিলেন তারই পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তৈরী হয়। এ থেকে এটাই প্রমাণ হয় পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল শরীফ উপলক্ষে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা পবিত্র মক্কা শরীফের অধিবাসীদের খুবই প্রাচীন ঐতিহ্য।







0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন