মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইমামে আযমের কান্না

ইমামে আযমের কান্না:

হযরত ইয়াযিদ বিন লাইছ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, মসজিদের ইমাম সাহেব এশার জামাতে সূরা 'ইযাযুলযিলা' তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর পিছনে ইমাম হযরত আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি নামায আদায় করছিলেন। নামায শেষে তাঁকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। এমন কি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিকমত বের হচ্ছিল না। আমি মনে করলাম, সম্ভবত তিনি বক্ষ ব্যাধিতে আক্রান্ত।
আমি এই মহান ইমামকে মসজিদে রেখে সেদিনের মত বাড়ি চলে এলাম। সুবহে সাদেকের সময় মসজিদে গিয়ে দেখি, তিনি সেই স্থানেই বসে আছেন, স্বীয় দাড়ি স্বহস্তে ধারণ করে কান্নাবিজড়িত অস্ফুট কণ্ঠে বলছেন, হে আমার ভাল কর্মের তিল-তিল করে বিনিময় দানকারী আল্লাহ! হে আমার মন্দ কর্মের তিল-তিল করে প্রতিদান দাতা প্রতিপালক! আপনি নো'মানকে আপনার সীমাহীন করুণার পাত্র বানান এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। (খাইরাতুল হিসান: ৫২)

জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট ছিলাম। যখন তিনি তাহাজ্জুদ নামায পড়ছিলেন তখনও আমি তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলাম। সে দিন তিনি নামাযে এতো বেশি কান্না-কাটি করেন যে, তাঁর অশ্রু চাটাইয়ে পতিত হওয়ার শব্দ পর্যন্ত আমার কানে আসছিল। মনে হচ্ছিল, যেন আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে। (খাইরাতুল হিসান: ৫৪)


হযরত ইয়াজিদ ইবনে কামাইয়াত রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, একদা হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি.-এর সামনে একটি রেশমি কাপড়ের গাট্টি খোলা হল, যাতে লাল, সবুজ ও হলুদ বর্ণের কাপড় ছিল। দোকানের কর্মচারী এসব দেখে বলে উঠল, আমরা আল্লাহর নিকট জান্নাত চাই। হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি একথা শুনে এত বেশি পরিমাণ কান্না-কাটি করলেন যে, তার মাথা ও কাঁধ আন্দোলিত হয়ে উঠল। তিনি কর্মচারীকে দ্রুত দোকান বন্ধ করতে বললেন এবং নিজে মাথা ঢেকে বের হয়ে গেলেন। পরের দিন তিনি আমাকে বলেন, আমরা মহান আল্লাহ পাকের নিকট জান্নাত চাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারি না। জান্নাতের প্রার্থনা তো সে করতে পারে, যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। আমাদের মত লোকদের শুধু ক্ষমা ও মুক্তির প্রার্থনা করা উচিৎ। (মানাকিবে আবু হানিফা: লিয-যাহাবী-২৩)

সুবহানাল্লাহ! এতবড় ইমামের কত বিনয়।

ওলী আল্লাহদের নামাজ ও আমাদের নামাজ

 ওলী আল্লাহদের নামাজ ও আমাদের নামাজ:

ওলীদের নামাজ


হযরত হাতেম আছেম রহমতুল্লাহি আলাইহির নিকট উনার নামায সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, যখন নামাযের সময় আসে, তখন আমি পরিপূর্ণরূপে ওযূ করি। এর পর জায়নামাযে এসে কিছুক্ষণ ধীরস্থিরভাবে অপেক্ষা করি। এভাবে সম্পূর্ণ শান্ত হওয়ার পর নামাযের জন্য দাঁড়াই।
তখন আমার অবস্থা এমন হয় যে, আমি মনে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ধ্যান করি, আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা আমার সামনে, পুলসেরাত আমার নীচে, জান্নাত আমার ডানে, জাহান্নাম আমার বামে এবং মৃত্যুর ফেরেশতা আযরাঈল আলাইহিস সালাম আমার পিছনে। সে সঙ্গে এ কথাও দৃঢ়ভাবে মনে করি, এটাই আমার জীবনের শেষ নামায, এর পরেই আমার মৃত্যু, এর পর আর কোন নামাযের সুযোগ হবে না। এ চিন্তা করেই আমি আল্লাহ পাকের প্রতি ভয় ও আশার মধ্যবর্তী স্তরে থেকে অত্যন্ত বিনয়াবনত হয়ে, নম্রতা ও একাগ্রতার সাথে 'আল্লাহু আকবার' বলে নামায শুরু করি।
এরপর সুস্পষ্ট ও ধীরস্থিরভাবে কেরাআত পাঠ করি। রুকু করি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে। সেজদায় অবলম্বন করি পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও নিষ্ঠা। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে বাম নিতম্বে উপবেশন করি, ডান পা খাড়া রেখে অঙ্গুলি কেবলার দিকে ফিরিয়ে রাখি এবং অন্তরে পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখি। এরপরেও আমি বলতে পারি না, আমার নামায আল্লাহ পাক উনার দরবারে গৃহীত হয়েছে কি না?

এদিকে নামাজের মধ্যে হাজার চিন্তা করে আমারও মুসল্লী।
আল্লাহ পাক আমাদের ক্ষমা করুন। 

এই যুদ্ধ আমেরিকার না, এ যুদ্ধ ইহুদিদের।

 এই যুদ্ধ আমেরিকার না, এ যুদ্ধ ইহুদিদের।


ইস*রায়েল বহু দিন ধরে গ্রেটার ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে। দাজ্জালের আগমনের রাস্তা তৈরী করছে, দাজ্জালের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফ ধ্বংস করে থার্ড টেম্পল তৈরি করবে এগুলো এখন কন্সপাইরেসি থিউরি না, বরং স্বীকৃত সত্য।
আমেরিকা বারবার পিছু হটতে চাইলেও ইহুদিরা টেনে ধরে রাখতেছে। আমেরিকার যুদ্ধ বন্ধ করে চলে গেলে ইসরায়েলের এতদিনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হবে, তাই যেকোনভাবে উস্কানি দিয়ে ইরানে গোপনে আক্রমন করে যাচ্ছে, বিনা কারনে লেবাননে হামলা করে পরিস্থিতি জটিল করে যাচ্ছে। যুদ্ধ বিরতি বানচাল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মুসলমান নামধারি মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি গোলামেরা ছবির মানচিত্রে একবার দেখো যদি গ্রেটার ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা হয়েই যায় তোমার অবস্থান কোথায় হবে?
আইডিএফের ইউনিফরম



ছবি: ইসরায়েলের সেনাবাহিনী আইডিএফের (IDF) ইউনিফরম দেখেন। সেখানে তাদের স্বপ্নের গ্রেটার ইসরায়েলের মানচিত্র আঁকা । তাদের চেতনা হচ্ছে আরবদের বিতাড়িত করে ইহুদি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তারা সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান, মিশরের কিছু অংশ এবং সৌদি আরবের একটা অংশ তাদের ভবিষ্যৎ ম্যাপের মধ্যে সীমানা এঁকে রেখেছে।
হয়তো বুঝতেই পারছেন বর্তমান এ যুদ্ধ কিসের?
ইরানের বিজয় সমগ্র মুসলমানদের বিজয় হবে, আর তাদের পরাজয়......।
আল্লাহ পাক হিফাজত করেন।

ইরান যুদ্ধ বুঝতে আপনাকে একটা বিষয় অবশ্যই ভালো করে বুঝতে হবে তা হলো পেট্রোডলার

ইরান যুদ্ধ বুঝতে আপনাকে একটা বিষয় অবশ্যই ভালো করে বুঝতে হবে তা হলো পেট্রোডলার।



আপনি যখন পৃথিবীর যেকোন দেশ থেকে কোন পন্য কিনেন তখন আপনার লেনদেনের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ বিনা পরিশ্রমে তৃতীয় একটি দেশ লাভবান হয়। দেশটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ লেনদেন হচ্ছে ডলারে। আপনি যখন যে কোন দেশে বেড়াতে যান বাংলাদেশ থেকে টাকা দিয়ে ডলার কিনে সেই ডলার নিয়ে বিদেশে যান। এরপরে বিদেশে গিয়ে ডলার বিক্রি করে সেই দেশের কারেন্সি কিনেন। ক্রেডিট কার্ড যেমন ভিসা বা মাস্টার কার্ড সঙ্গে নেন। সেটাতেও এনডোর্স করে নেন ডলার। দুইটাই কিন্তু মার্কিন কোম্পানি। সব দিকেই আমেরিকার লাভ।

    এটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাস্তবতা। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল চললো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সবাই যুদ্ধ করতেছে। সবাই মরিয়া হয়ে খুঁজতেছে হাতিয়ার গোলাবারুদ এবং অস্ত্র। মিত্রবাহিনী অর্থাৎ ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে হয় অস্ত্র, না হয় রসদ, না হয় কাঁচামাল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিক্রি করেছে কে? আমেরিকা। এই ব্যবসাটি কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকা করেছিলো। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে করেছিল অনেক বড় পরিসরে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে সরাসরি অংশ নেয়নি আমেরিকা। ব্যবসা কিন্তু প্রথম থেকেই ঠিকই করেছে। ট্যাংক, বিমান, গোলাবারুদ বিক্রি করেছে প্রচুর। কিন্তু বিনিময়ে পেমেন্ট হিসেবে নিয়েছে কি? স্বর্ণ অর্থাৎ গোল্ড। ইউরোপের দেশগুলো বিশেষ করে সে সময়ের পরাশক্তি ব্রিটেন তাদের স্বর্ণ ভান্ডার ঢেলে দিচ্ছিল আমেরিকার কাছে।

    এদিকে ১৯৪১ সালে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু খেয়াল করুন আমেরিকার মূলভূমিতে কিন্তু কোন যুদ্ধ হয়নি। সেখানে কলকারখানা স্বাভাবিক গতিতে চলেছে। এবং যুদ্ধের শেষ দিকে দেখা গেলো পৃথিবীর মোট স্বর্ণের প্রায় ৭০% জমা হয়ে গেছে আমেরিকার কোষাগারে। ইউরোপ হয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপ আর আমেরিকা অক্ষত এবং অকল্পনীয় ধনী। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৪ সালে ঘটলো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আমেরিকার নিউ হ্যামশেয়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটনউড শহরে জড় হল ৪৪ টি দেশের প্রতিনিধি। লক্ষ্য একটাই যুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নির্ধারন করা। এখানেই জন্ম হলো ব্রেটনউড সিস্টেমের। ঠিক হলো অন্য দেশগুলোর কারেন্সি আমেরিকান ডলারের সাথে একটি নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জ রেটে বাঁধা থাকবে। আর আমেরিকার ডলার সরাসরি স্বর্ণের সাথে বাঁধা থাকবে। অর্থাৎ মার্কিন ডলার হবে গোল্ড ব্যাক কারেন্সি। ৩৫ মার্কিন ডলার হবে এক কাউন্স গোল্ডের সমান। ফলে পুরো পৃথিবীর মুদ্রা ব্যবস্থার মেরুদন্ড হয়ে গেল আমেরিকান ডলার।

কেন অন্য দেশগুলো রাজি হয়েছিল? কারণ তাদের কাছে কার্যত কোন বিকল্প ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা ইউরোপ ভেঙে পড়েছিলো। সে সময়কার সুপারপাওয়ার ব্রিটেন তখন কার্যত দেউলিয়া। হাতে কোন স্বর্ণের মজুদ নেই। ওদিকে আমেরিকার কাছে আছে স্বর্ণ, আছে মিলিটারি পাওয়ার। তাই আমেরিকার মুদ্রাকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হলো বাকি পৃথিবী।
ব্রেটনউড সিস্টেমে কোন দেশ জমানো ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ চাইলে আমেরিকা দিতে বাধ্য। মানে ডলার ছিল এক প্রকার স্বর্ণের রশিদ বা ভাউচার। আপনি ৩৫ ডলার পকেটে নিয়ে ঘুরতেছেন। মানে হলো আপনার পকেটে এক আউন্স গোল্ডের সমপরিমাণ সম্পদ আছে। এটাই ছিল ডলারের উপরে বিশ্বাসের ভিত্তি। কিন্তু এই ভরসা টিকে ছিল মাত্র ২৭ বছর। তাহলে ভরসা নষ্ট হলো কিভাবে? ১৯৫৫ সাল ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হল। চললো ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর। ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট টেকওভার ঠেকাতে আমেরিকা জান প্রাণ দিয়ে যুদ্ধে নামলো। অঢেল অর্থ ব্যয় করতে শুরু করল সেখানে। তখন মার্কিন সরকার আয়ের চেয়ে ব্যয় করছে বেশি। এই ব্যয় তাহলে কিভাবে মেটাচ্ছে? স্বর্ণ তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না। কিন্তু ডলার ডলার তো মার্কিন সেন্ট্রাল ব্যাংক অর্থাৎ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সম্পত্তি। মার্কিন সরকার চাচ্ছে আর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ইচ্ছামত ডলার ছাপিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ মার্কিন সরকার যুদ্ধের ব্যয় মেটাচ্ছে ডলার ছাপিয়ে। যে হারে ডলার ছাপানো হচ্ছে গোল্ডের মজুদ সেই হারে তো বাড়তেছে না। তাহলে কি হবে?

ধরুন কথার কথা আমেরিকার কাছে ১০০ আউন্স স্বর্ণ আছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩৫ ডলার সমান এক আউন্স গোল্ড। নিয়ম অনুযায়ী থাকার কথা সে হিসেবে ৩৫০০ ডলার। এখন মার্কিন সরকার যদি যুদ্ধের খরচ মেটাতে জোর করে আরো ৩৫০০ ডলার ছাপিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয় তাহলে কি হবে? স্বর্ণ কিন্তু সেই ১০০ আউন্স থাকলো। কিন্তু ডলার হয়ে গেল দ্বিগুণ। এর মানে কি? এর মানে হলো বাস্তবে ৩৫ ডলার আগের মত ওয়ান আউন্স স্বর্ণকে আর রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে না। ডলার তার ভ্যালু হারাবে। অথচ আমেরিকা তখনো দুনিয়াকে মিথ্যা গ্যারান্টি দিচ্ছে যে ডলার দিলেই নির্ধারিত রেটে স্বর্ণ পাবেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শালদ গোল বুঝলেন পরিস্থিতি। তিনি দেখলেন আমেরিকা যেভাবে ডলার ছাপাচ্ছে তাতে এই ব্রেটনউড সিস্টেম ভবিষ্যতে আমেরিকা আর রক্ষা করতে পারবে না। সুতরাং সময় থাকতে থাকতে ফ্রান্সের হাতে থাকা ডলারগুলো স্বর্ণে কনভার্ট করে ফেলাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ফ্রান্স প্রতিমাসে আমেরিকায় জাহাজ পাঠাতে লাগলো। জমানো ডলার রিটার্ন দিয়ে স্বর্ণ ফেরত নিতে শুরু করল। ফ্রান্সের দেখাদেখি জার্মানিও একই পথে হাঁটলো। আমেরিকার সোনার ভান্ডার দ্রুত কমতে লাগল। আমেরিকা দেখল অবস্থা খারাপ। মার্কিন ডলারের উপর থেকে খোদ ফ্রান্স এবং জার্মানির মত দেশের আস্থা হারিয়ে গেছে।

ডলার রিজার্ভ কারেন্সি হওয়াতে আমেরিকা একটা বিশেষ সুবিধা পায়। পণ্য আমদানি বাবদ যে পেমেন্ট সেটা সে ডলার ছাপিয়ে করে দিতে পারে। কিন্তু যদি আমেরিকাকে ডলারের বদলে ইউরোতে পেমেন্ট করতে হতো তাহলে কি হতো? তখন সে কি করতো? যেমন বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কেনে ডলারের বিনিময়ে এই ডলার আগে বাংলাদেশকে কিন্তু আয় করতে হয়। এরপর তো ব্যয় করে। কথার কথা যদি টাকা দিয়েই পেমেন্ট করা যেত তাহলে তো টাকা ছাপিয়ে ইচ্ছামত পেমেন্ট করে দেয়া সম্ভব হতো। কিন্তু টাকার পেমেন্ট করতে চাইলে কোন দেশ রাজি হবে না।

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা করলেন আমেরিকা গোল্ড ব্যাক কারেন্সি থেকে সরে যাবে। ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় নিক্সন শক। এবার চিন্তা করুন বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর কথা যারা তাদের ফরেন রিজার্ভ রেখেছে মার্কিন ডলারে। রাতারাতি তারা এক নতুন বাস্তবতার সামনে এসে পড়ল। বিখ্যাত বিনিয়োগকারী রেডালিও সেই রাতের কথা তার বইতে লিখেছিলেন। সবাই ভেবেছিল আমেরিকার শেয়ার বাজার ধসে পড়বে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেয়ার বাজার উল্টো ৪% বেড়ে গেল। কিন্তু কেন?
ধরুন আপনি জানতে পারলেন ভয়াবহ ইনফ্লেশন হবে সামনে ১০০ টাকা ১০০ টাকাই থাকবে কিন্তু সেটার পারচেস পাওয়ার অর্ধেক হয়ে যাবে।

নিক্সন শকের পর আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছিল ডলার যেহেতু স্বর্ণের বাধন থেকে এখন মুক্ত সেহেতু মার্কিন সরকার এবার ইচ্ছামত কাগজে ডলার ছাপাবে। আগেও কিন্তু ছাপাচ্ছিলো। আর এখন তো কোন বাধাই নাই। আর যত বেশি ডলার ছাপাবে ডলারের মান তত কমবে। তাই তারা ক্যাশ ডলার হাতে না রেখে সেই ডলার দিয়ে হুরমুর করে মার্কিন কোম্পানির শেয়ার কেনা শুরু করল স্টক মার্কেটে গিয়ে। ফলাফল স্টক মার্কেট চাঙ্গা হয়ে গেল। এখন আমেরিকার ভেতরের মানুষ না হয় শেয়ার কিনলো। কিন্তু আমেরিকার বাইরে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ডে সারা পৃথিবীর দেশগুলো তো আর বোকা না। তারা ভাবলো যে ডলারের পেছনে কোন স্বর্ণের গ্যারান্টিই নেই সেই মূল্যহীন কাগজ আমরা কেন জমিয়ে রাখবো? কেন আমরা আমাদের পণ্য আমেরিকার কাছে বিক্রি করে পেমেন্ট হিসেবে কাগজের ডলার নেব? আর ঠিক এখানেই তৈরি হলো আমেরিকার জন্য এক জীবনমরণ সংকট। পৃথিবী যদি ডলার ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমেরিকার আর্থিক আধিপত্য তাশের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। সুতরাং যেকোন মূল্যে ডলারের চাহিদা ধরে রাখতে হবে। ডলারকে বাঁচাতে হবে। আর এই খাদের কিনারা থেকে ডলারকে বাঁচাতে আমেরিকা এক অবিশ্বাস্য চাল চাললো।

জন্ম নিল পেট্রোডলার সিস্টেম। আধুনিক সভ্যতার ব্লাড বা রক্ত হলো তেল। এই তেল ছাড়া আধুনিক সভ্যতা এক কদমই এগুতে পারবে না। আর এই তেলের ভান্ডার হলো মধ্যপ্রাচ্য। সালটি ছিল ১৯৭৩, অক্টোবর মাস। শুরু হলো আরব ইসরাইল যুদ্ধ। আমেরিকা সহ পশ্চিমা দেশগুলো ইসরাইলকে সমর্থন দিল। প্রচুর অস্ত্র পাঠালো। আর এতেই চরম ক্ষেপে গেল আরব বিশ্ব। তেল রপ্তানিকারক আরব দেশগুলো এক হয়ে ঘোষণা দিল আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধ। ফলাফল রাতারাতি বিশ্ববাজারে তেলের দাম চার গুণ হয়ে গেল। এক ব্যারেল তেলের দাম ১ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে এক লাফে বেড়ে হয়ে গেল ১২ ডলার। আমেরিকার রাস্তায় তেলের পাম্পে মাইলের পর মাইল গাড়ির লাইন তৈরি হলো। আমেরিকার অবস্থা তখন আসলেই নাজুক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিশাল খরচ মেটাতে গিয়ে মার্কিন সরকার এমনিতেই বিশাল বাজেট ঘাটতি নিয়ে চিন্তিত ছিল। আমেরিকার তৎকালীন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সাইমন বুঝতে পারলেন এই তেল সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু আমেরিকা নয় পুরো বিশ্বের ফাইনান্সিয়াল মার্কেট ধসে পড়বে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উইলিয়াম সাইমন একটি সরকারি বিমানে উঠলেন। গন্তব্য সৌদি আরব। উদ্দেশ্য স্পেশাল মিশন। গবেষক ডেভিড স্পিরো তার বিখ্যাত বই দ্যা হিডেন হ্যান্ড অফ আমেরিকান হেজিমনিতে তুলে ধরেছেন সেই সফরের বিবরণ। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল কি জানেন?

    তেলের দাম কমানো মোটেই না। উদ্দেশ্য ছিল একদম ভিন্ন। যাকে বলা হয় দ্যা গ্রেটেস্ট ফাইনান্সিয়াল ডিল ইন হিস্ট্রি। সেই সময় সৌদি আরব শুধু একটা সাধারণ তেল উৎপাদনকারী দেশ ছিল না। তাদের কাছে ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভ এবং সবচেয়ে বেশি তেল উত্তোলনের ক্ষমতা। সৌদি আরব চাইলে একাই তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে সারা বিশ্বে তেলের দাম তলানিতে নামিয়ে দিতে পারতো। আবার উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে তেলের দাম বিশ্ববাজারে আকাশছোয়া করে দিতে পারতো। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কি হবে তার রিমোট কন্ট্রোল এক প্রকার পুরোটাই ছিল সৌদিদের হাতে। মিস্টার সাইমন সৌদি রাজপরিবারকে একটা অফার দিলেন। অফারটি ছিল আমেরিকা সৌদি আরবকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে। তাদের তেলের খনিগুলোকে পাহারা দেবে। শত্রু দেশের হাত থেকে তাদের রাজতন্ত্রকে রক্ষা করবে। তেলের দাম এবং প্রোডাকশন কন্ট্রোল করতে দেবে ফুল সাপোর্ট। কিন্তু বিনিময়ে সৌদি আরবকে করতে হবে দুটি কাজ। এক, তাদের তেল বিক্রি করতে হবে শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে, অন্য কোন মুদ্রায় নয়। দুই, তেল বিক্রি করে সৌদি আরব যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাভ করে সেই টাকা দিয়ে কিনতে হবে আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড। অর্থাৎ আমেরিকার টাকা বা মার্কিন ডলার ঘুরে ফিরে আবার আমেরিকাতেই ফেরত যাবে। আর পুরো দুনিয়া যখন তেল কিনতে যাবে তাদের বাধ্য হয়ে খুঁজতে হবে ডলার। তৈরি হবে ডলারের ভয়াবহ ডিমান্ড। এটাই হলো সেই বিখ্যাত পেট্রোডলার সিস্টেম। জন পারকিন্স তার দা কনফেশন অফ এন ইকোনমিক হিটম্যান বইতে তুলে ধরেছেন পুরো প্ল্যান। পার্কিংস তার বইতে পরিষ্কার লিখেছেন এই সত্যটা এমনভাবে দেয়া হয়েছিল সৌদি আরবের না বলার কোন অপশনই ছিল না। কারণ সৌদি আরব খুব ভালো করেই জানতো পশ্চিমাদের তেল স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিণতি কি ভয়াবহ হতে পারে। তারা চোখের সামনেই দেখেছিল তাদের প্রতিবেশী ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের কি করুণ পরিণতি হয়েছিল। সাধারণ নিয়মে দুনিয়ার যেকোনো দেশকে আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড কিনতে হলে পাবলিক নিলামে প্রতিযোগিতা করে কিনতে হয়। গবেষক ডেভিড স্পিরো তার বই দা হিডেন হ্যান্ড অফ আমেরিকান হেজিমনিতে নথিপত্র ঘেটে প্রমাণ করেছেন ১৯৭৪ সালে সাইমন সৌদি আরবের সাথে এক গোপন ডিল সাইন করে যার অফিশিয়াল নাম ছিল অডঅন আরেঞ্জমেন্ট। এই এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী সৌদি আরবের জন্য পুরো সিস্টেম চেঞ্জ করে ফেলা হয়। তারা সাধারণ নিলামের বাইরে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে সরাসরি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বন্ড কেনা শুরু করল। কিন্তু আমেরিকা কেন এই চুক্তিটা পৃথিবীর কাছে লুকিয়ে রেখেছিল? কারণ আমেরিকা তার নিজেদের মিত্র মানে ইউরোপ এবং জাপানকে কথা দিয়েছিল যে ওপেকের তেলের টাকা নিজেদের পকেটে টানতে কাউকে কোন স্পেশাল সুবিধা দেয়া হবে না। অথচ পর্দার অন্তরালে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশগুলোর পিঠেই ছুরি মেরেছিলো আমেরিকা। সৌদিদের তারা এমন এক একচেটিয়া সুবিধা দিচ্ছিল যা দুনিয়ার আর কোন দেশকে দেয়া হয়নি। এর কয়েক বছর পর পরবর্তী মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি মাইকেল ব্লুমেন্থাল করলেন আরেকটি সিক্রেট ডিল। এবার ওপেক গ্যারান্টি দিল পুরো বিশ্বের তেলের দাম এখন থেকে শুধু ডলারেই নির্ধারিত হবে। ব্যাস এই দুই গোপন চুক্তির উপর দাঁড়িয়েই জন্ম নিল পেট্রোডলার সিস্টেম। কি অবিশ্বাস্য একটা সিস্টেম। সৌদি আরব আর ওপেকভুক্ত দেশগুলো সারা দুনিয়ার কাছে তেল বেঁচে ডলার কামাচ্ছে। সেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে তারা কিনতেছে আমেরিকার সরকারি বন্ড। মানে আমেরিকার ডলার ঘুরে ফিরে আবার আমেরিকার পকেটেই ফিরে যাচ্ছে। সার্কেল কমপ্লিট মানে পুরাই ম্যাজিক। বিখ্যাত ইকোনমিস্ট মাইকেল হারডসন তার সুপার ইম্পেরিয়ালিজম বইতে দেখিয়েছেন ১৯৭১ সালে সেই নিক্সন শকের পর দুনিয়াতে এক অদ্ভুত সিস্টেম তৈরি হলো। কি সেই সিস্টেম? আমেরিকা যখন সংকটে পড়ে তারা কি করে? খুব সিম্পল। মেশিন চালিয়ে কারি ডলার ছাপায়। সেই ডলার যায় কোথায়? বিদেশী দেশগুলোর সেন্ট্রাল ব্যাংকের রিজার্ভে। আর সেই রিজার্ভের ডলার দিয়ে ওই দেশগুলো কি করে? আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডে ইনভেস্ট করে। দুনিয়ার নানান দেশের ফরেন রিজার্ভ আমেরিকাতেই থাকে। মার্কিন সরকার তাদের বাজেটের ঘাটতি মেটাচ্ছে। হারসন লিখেছেন, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জন কলানি ইউরোপিয়ানদের মুখের উপরে হেসে দিয়ে রসিকতা করে একবার বলেছিলেন 'ডলার ইজ আওয়ার কারেন্সি বাট ইট ইজ ইওর প্রবলেম'। এই পেট্রোডলার সিস্টেমের বাইরে যারাই যাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের উপরে বিপদ নেমে এসেছে জন পারকিন্স তার বইতে লিখেছেন যে কোন দেশে আমেরিকা প্রথমে পাঠায় যাদের তারা হলো ইকোনমিক হিটম্যান। খেয়াল করুন এরা সুট-টাই পড়ে হাতে ব্রিফকেস নিয়ে সেই দেশের নেতাদের কাছে যায়। বিশাল স্বপ্নের টোপ দেয়। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণের অফার আসে। স্বপ্ন দেখায় এই টাকায় মেগা মেগা প্রজেক্ট হবে। বড় বড় পাওয়ার প্লান্ট, ডিপ-সি পোর্ট, বিশাল হাইওয়ে এসব তৈরি হবে। নেতারা খুশিতে গদগদ। কিন্তু মেকানিজমটা দেখুন। ঋণ আসবে আমেরিকা থেকে। কিসের জন্য? মেগা প্রজেক্টের জন্য সেই মেগা প্রজেক্টের ঠিকাদার কারা? আমেরিকারই কর্পোরেশন ব্যাকটেল, হ্যালিবাটন স্টোন এন্ড ওয়েবস্টার অথবা তাদের মিত্র দেশের কোম্পানিগুলো।

মজার বিষয় হলো, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে দেয়া ঋণের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অনেক সময় আমেরিকার বর্ডারই ক্রস করবে না। কিভাবে? এক মার্কিন ব্যাংক থেকে বের হয়ে সরাসরি আরেক আমেরিকান কোম্পানির একাউন্টে ঢুকে যাবে। মাঝখান থেকে ওই গরীব দেশটা ফেসে যাবে পাহাড় সমান ঋণের দায়ে। আর যখন এই ঋণ শোধ করতে পারবে না তখন শুরু হবে প্ল্যান বি। মাঠে নামবে আইএমএফ। তারা বলবে ঋণের টাকা দিতে পারতেছো না। ঠিক আছে। তোমার দেশের সরকারি খাতগুলো প্রাইভেটাইজেশন করো। জনগণের ভর্তুকি কেটে দাও। শ্রম আইন শিথিল করো। সোজা কথায় দেশের জাতীয় সম্পদ পানির দামে বিদেশী কর্পোরেশনের কাছে বিক্রি করে দাও। আর যে নেতা এই বাটপারিতে রাজি হবে না তার জন্য অপেক্ষা করতেছে আমেরিকার প্ল্যান সি। তাদের মদদপুষ্ট গোপন বাহিনী হয় দেশে মিলিটারি কু ঘটাবে নয়তো ওই নেতার গাড়িতে বা বিমানে রহস্যজনকভাবে দুর্ঘটনা ঘটবে নেতা মারা যাবে। এভাবেই পেট্রো ডলার এবং ইকোনোমিক হিটম্যানের উপরে ভর করে আমেরিকা গড়ে তুলেছে এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য।

এত সাধের সম্রাজ্য ছেড়ে আমেরিকা সহজেই যেতে চাইবে? বর্তমান ইরান যুদ্ধে আমেরিকা এসে ফেঁসে গেছে। তারা চলে যেতে পারছে না, কারন একবার পেট্রোডলার সিস্টেম ভেঙে গেলে ডলার নামক কাগুজে নোটের কোন মূল্যই থাকবে না। কোন দেশ আর ডলারে লেনদেনে আগ্রহী বা সাহসী হবে না। বিনিয়োগ ধ্বংস হয়ে যাবে।

ইরান বর্তমানে মার্কিনীদের এই আকাঙ্খাতে হস্তক্ষেপ করছে। পেট্রোডলারের মুখে চপেটাঘাত করেছে। আমেরিকাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বের হতে কিন্তু যে জালে আটকে গেছে বের হওয়ার সুযোগ নাই। পৃথিবীর কোন কারেন্সি সারাজীবন রাজত্ব করতে পারে নাই, ডলারও পারবে না। সে দিন হয়তো আমারা দেখতে পাবো। 

নবিজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার বিষয়ে “মুসলিম শরীফের” সেই বর্ণনার স্মরূপ সন্ধান।

নবিজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার বিষয়ে “মুসলিম শরীফের” সেই বর্ণনার স্মরূপ সন্ধান। 



হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য উনার পিতা-মাতা বিষয়ে বাতিল ফিরকার লোকেরা বিভিন্ন এলোমেলো কথা বলে থাকে। উনাদের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নাউযুবিল্লাহ!

তাদের দাবির স্মরূপ উন্মোচনের জন্য এ কলাম লিপিবদ্ধ করা হলো।
তারা মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে সিহাহ ছিত্তার অন্যতম কিতাব “মুসলিম শরীফে” বর্ণিত একটা বর্ণনার আশ্রয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বর্ণনাটি সনদসহ উল্লেখ করা হলো,
حَدَّثَـنَا أَبُـوْ بَكْرِ بْنُ أَبِيْ شَيْـبَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا عَفَّانُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَيْنَ أَبِيْ؟ قَالَ: فِي النَّارِ، فَـلَمَّا قَـفَّى دَعَاهُ، فَـقَالَ: ‌إِنَّ ‌أَبِيْ ‌وَأَبَاكَ ‌فِي ‌النَّارِ
অর্থ: এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন, জাহান্নামে। তখন এটা তার নিকট কষ্টদায়ক হল। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাকে ডেকে বললেন, আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামে। নাউযুবিল্লাহ! (মুসলিম শরীফ -কিতাবুল ঈমান: হাদীছ ৩৪৭)

এই বর্ণনা থেকে তারা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতার বিষয়ে জঘণ্যতম অপবাদ উপস্থান করে। একটা বিষয় গভীরভাবে খেয়াল রাখা উচিত ও সর্তক থাকা উচিত “যদি কোন কিতাবে তা যে কিতাবই হোক না কেন সেখানে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম, হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কিছু থাকলে সে বর্ণনা চোখ বুজে গ্রহন করা যাবে না।” সেই বর্ণনার আদ্যপান্ত অনুসন্ধান করে দেখতে হবে কোথাও কোন ঘাপলা আছে কিনা। এর মানদণ্ডে উপরোক্ত বর্ণনার স্বরূপ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে বর্ণনা প্রকৃত চিত্র।

উক্ত আপত্তিকর বর্ণনার সনদ হচ্ছে-
حَدَّثَـنَا أَبُـوْ بَكْرِ بْنُ أَبِيْ شَيْـبَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا عَفَّانُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ
অর্থ: হাদীছ শরীফ বর্ননা করেন- হযরত আবু বকর ইবনে আবী শায়বা রহমতুল্লাহি আলাইহি, তিনি হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে।

মুসলিম শরীফের এই সনদ সহ বর্ণনা উল্লেখ করে ইমাম হযরত বাযযার রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وَهٰذَا الْحَدِيْثُ لَا نَـعْلَمُ رَوَاهُ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ إلَّا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ
এই হাদীছ শরীফখানা হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি ব্যাতীত অন্য কারো থেকে বর্ণিত হয়নি। (মুসনাদে বাযযার ৬৮০৮; প্রকাশনা- মাকতাবাতুল মাদীনাতুল মুনাওয়ারা)

উক্ত বর্ণনা বিষয়ে হাফিজুল হাদীছ, হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
أَنَّ هٰذِهِ اللَّفْظَةَ وَهِيَ قَـوْلُهٗ: إِنَّ أَبِيْ وَأَبَاكَ فِي النَّارِ لَمْ يَـتَّفِقْ عَلٰى ذِكْرِهَا الرُّوَاةُ، وَإِنَّمَا ذَكَرَهَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، وَهِيَ الطَّرِيْقُ الَّتِيْ رَوَاهُ مُسْلِمٌ مِنْـهَا
উল্লেখিত ইবারতটি ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ এর ব্যাপারে বর্ণনাকারীগণ ঐকমত্য পোষণ করেননি। এটা বর্ণনা করেছেন হযরত হাম্মাদ বিন সালমা তিনি। তিনি ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এই সূত্রেই হাদিস শরীফখানা বর্ণনা করেছেন। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই ব্যাপারে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সনদে ও ভিন্ন মতনে সহীহ হাদীছ শরীফ উল্লেখ আছে। আপত্তিকর বর্ণনাটি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয় বর্ণনাটি হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সনদে ব্যতিক্রমভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সেখানে ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ বাক্যটি উল্লেখ করেননি।
ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই সনদখানা উল্লেখ করেছেন উনার কিতাবে,
‌رِوَايَةُ ‌مَعْمَرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌عَنْ ‌ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌عَنْ ‌أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ
হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩, সুবলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ১/২৪৮, ফতহুর রব্বানী ৮/১৭০)

হযরত ইমাম যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে উল্লেখ করেন,
وَقَدْ أَعَلَّ السُّهَيْلِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، هٰذَا الْحَدِيْثَ بِأَنَّ مَعْمَرَ بْنَ رَاشِدٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فِيْ رِوَايَــتِهٖ عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ خَالَفَ حَمَّادًا، فَـلَمْ يَذْكُرْ أَنَّ أَبِيْ وَأَبَاكَ فِي النَّارِ، بَلْ قَالَ: إِذَا مَرَرْتَ بِقَبْرٍ كَافِرٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ
ইমাম হযরত সুহাইলী রহমতুল্লাহি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এই বর্ণনাটি হযরত মা’মার ইবনে রশিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে রেওয়ায়েত করেন, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন। সেখানে তিনি ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ এ ধরণের কোন কথা উল্লেখ করেননি বরং তিনি উল্লেখ করেছেন, “ যখন তুমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে।” (শরহু যারকানী আলাল মাওয়াহেব ১/৩৩৭; প্রকাশনা- দারু কুতুব আল ইলমিয়া, বাইরূত- লেবানন)

আপত্তিকর বর্ণনাটির বিষয়ে মুসনাদে আহমদে উক্ত হাদীছ শরীফের টীকায় উল্লেখ আছে-
رِجَالُهٗ ثِقَاتٌ رِجَالُ الشَّيْخَيْنِ غَيْـرَ حَمَّادٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، وَهُوَ اِبْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَمَنْ رِجَالُ مُسْلِمٍ، وَقَدْ تَـفَرَّدَ بِرِوَايَةِ هٰذَا الْحَدِيْثِ بِـهٰذَا اللَّفْظِ، وَخَالَفَهٗ مَعْمَرٌ عَنْ ثَابِتٍ
বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত, বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের রাবী, তবে হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি ব্যাতীত। তিনি হচ্ছেন ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি মুসলিম শরীফের রাবী। তিনি এককভাবে এই শব্দে এই বর্ণনাটি (আপত্তিকর বর্ণনাটি) উল্লেখ করেছেন। অথচ হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে এর ভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন (অর্থাৎ সেখানে আপত্তিকর কথাটি নেই)। (মুসনাদে আহমদ ১২১৯২ নং হাদীছ শরীফ উনার টীকায় সমসাময়িক তাহকীককারী শুয়াইব আরনাউতের তাহকীক)

সূতরাং হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির এই ইবারতটি কখনো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামকে অন্তর্ভূক্ত করে না। কারণ উক্ত সনদটির চাইতে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহির সনদ অধিক শক্তিশালী। কারণ হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির চেয়ে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি অধিক নির্ভরযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
فَإِنَّ حَمَّادًا رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، تُكُلِّمَ فِيْ حِفْظِهٖ وَوَقَعَ فِيْ أَحَادِيْثِهِ مَنَاكِيْـرُ ذَكَرُوْا أَنَّ رَبِيْـبَةَ دَسَّهَا فِيْ كُتُبِهِ، وَكَانَ حَمَّادٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، لَا يَحْفَظُ فَحَدَّثَ بِهَا فَـوَهِمَ فِيْهَا، وَمَنْ ثُـمَّ لَـمْ يُخَرِّجْ لَهُ الْبُخَارِيُّ شَيْـئًا، وَلَا خَرَّجَ لَهُ مُسْلِمٌ فِي الْأُصُوْلِ إِلَّا مِنْ رِوَايَتِهِ عَنْ ثَابِتٍ
হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে এবং উনার বর্ণনার মধ্যে অনেক মুনকার বর্ণনা রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, রবিবাহ তার কিতাবে ভুলক্রমে বিষয়টি ছেড়ে দিলেন। কিন্তু হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বিষয়টি সংরক্ষণ রাখতে পারেননি এবং এভাবেই বর্ণনা করলেন। সুতরাং এ ব্যাপারটি লক্ষ্যণীয়। তদুপরি হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে কোন হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেননি। ইমাম হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিও প্রকৃতপক্ষে হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির হাদীছ শরীফ ছাড়া অন্য কোন বর্ণনা উল্লেখ করেননি। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩; প্রকাশনা- দারুল ফিকর, বাইরূত, লেবানন)

হযরত ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাদখাল কিতাবে বলেছেন,
مَا خَرَجَ مُسْلِمٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، لِحَمَّادٍ فِى الْاُصُوْلِ اِلَّا مِنْ حَدِيْثِهِ عَنْ ثَابِتٍ
অর্থ: ইমাম হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির হাদীছ শরীফ ব্যতীত অন্য কোন হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেননি। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ ১/২৪৮)
লা’মাযহাবীদের মুরুব্বী নাসিরুদ্দীন আলবানীও তার ছহীহ সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় ৬/২৮ পৃষ্ঠায়ও এই কথা উল্লেখ করেছে।

যে রাবীকে নিয়ে আপত্তি সেই হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির বিষয়ে হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার আসমাউর রেজালের কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
قَالَ الْبَيْهَقِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌هُوَ ‌أَحَدُ ‌أَئِمَّةِ ‌الْمُسْلِمِيْنَ ‌اِلَّا ‌أَنَّهٗ ‌لَمَّا ‌كَبِرَ ‌سَاءَ ‌حِفْظُهٗ ‌فَلِذَا ترَكَهُ الْبُخَارِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، وَأَمَّا مُسْلِمٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَاَجْتَـهَدَ
অর্থ: হযরত ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তিনি (হযরত হাম্মাদ ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি) মুসলিম ইমামদের একজন হলেও বৃদ্ধ বয়সে তার স্মরণ শক্তিতে সমস্যা দেখা দেয়। এ জন্য হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে পরিত্যাগ করেছেন, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব ৩/১৪)

ইমাম হযরত যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেন,
وقَالَ حَضْرَتِ الذَّهْبِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَضْرَتْ حَمَّادُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ثِقَةٌ لَهٗ أَوْهَامٌ وَمَنَاكِيْـرُ كَثِيْـرَةٌ
ইমাম হযরত যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমাম হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিশ্বস্ত কিন্তু স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ার পর তার দ্বারা অনেক মুনকার বর্ণনার সৃষ্টি হয়। (শরহু যারকানী আলাল মাওয়াহেব ১/৩৩৭)

এ থেকে প্রমাণিত হলো হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির শেষ বয়সে স্মরনশক্তিতে ত্রুটি দেখা দেয় এবং তার বর্ণনায় পরিবর্তন পরিবর্ধন সৃষ্টি হয়। আর হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত আপত্তিকর বর্ণনাটি বিচ্ছিন্ন ও একক একটি বর্ণনা যা অন্য কেউ বর্ণনা করেনি। অপরদিকে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে আরেকটি বিশুদ্ধ সনদ যা হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত হয়েছে যেখানে আপত্তিকর কথাটি নেই। আর হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَأَمَّا مَعْمَرٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَـلَمْ يُـتَكَلَّمْ فِيْ حِفْظِهٖ وَلَا اُسْتُـنْكِرَ شَيْءٌ مِنْ حَدِيْثِهٖ، وَاتَّـفَقَ عَلَى التَّخْرِيْجِ لَهُ الشَّيْخَانِ فَكَانَ لَفْظُهُ أَثْـبَتَ
কিন্তু হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্মৃতিশক্তি সম্বন্ধে কেউ কোন আপত্তি করেননি। এবং উনার কোন বর্ণনা মুনকার পর্যায়ের নেই। তাছাড়া শাইখাইন হযরত বুখারী ও মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিম তার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ গ্রহনের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। অতএব উনার বর্ণনা অধিক নির্ভরযোগ্য। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)


হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার শানের খেলাফ মুসলিম শরীফের আলোচ্য বর্ণনাখানার বিপরীতে আরো কমপক্ষে ৫ জন ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম থেকে ভিন্ন সনদে বর্ণনা আছে, যেখানে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতার বিষয়ে আপত্তিকর কথা তো দূরের কথা বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা উল্লেখ আছে।

বর্ণনা নং ১ঃ
পূর্ণ বর্ণনাখানা উল্লেখ করা হলো-
عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، عَنْ أَبِيْهِ، أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيْنَ أَبِيْ؟ قَالَ فِي النَّارِ. قَالَ: فَأَيْنَ أَبُوكَ؟ قَالَ حَيْثُ مَا مَرَرْتَ ‌بِقَبْرِ ‌كَافِرٍ ‌فَـبَشِّرْهُ ‌بِالنَّارِ
অর্থ: হযরত আমীর ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার পিতা হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলল- ‘আমার পিতা কোথায়? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, জাহান্নামে। অতঃপর লোকটি বলল আপনার পিতাজান তিনি কোথায়? হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন তুমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। (মুসনাদে বাযযার ১০৮৯, দালায়েলুন নবুয়াত লিল বায়হাকী১/১৯২)

এই সনদের ব্যাপারে ইমাম হযরত নুরুদ্দীন ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وَرِجَالُهٗ رِجَالُ الصَّحِيْحِ
উক্ত বর্ণনার সকল রাবী বুখারী মুসলিম শরীফের রাবী। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ আল মানবাউল ফাওয়ায়েদ ২/২০৮: বর্ণনা ৪৬৮)

ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উপরোক্ত হাদীছ শরীফের সনদের বিষয়ে বলেন,
وَهٰذَا إِسْنَادٌ عَلٰى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ
এই সনদখানা ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। (আল হাওয়ী লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)

এ হাদীছ শরীফ থেকে আমরা দেখতে পেলাম এখানে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার শান মুবারকের খিলাফ কোন কথা বলা হয়নি বরং প্রশ্নকারীকে একটা আমল বলে দেয়া হয়েছে।

বর্ণনা নং ২ঃ
ছিহাহ ছিত্তার অন্যতম কিতাব ইবনে মাজাহ শরীফে ভিন্ন সনদে আরো একখানা হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে,
عَنْ سَالِـمٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَبِيْهِ، قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ أَبِيْ كَانَ يَصِلُ الرَّحِمَ، وَكَانَ وَكَانَ، فَأَيْنَ هُوَ؟ قَالَ فِي النَّارِ قَالَ: ‌فَكَأَنَّهٗ ‌وَجَدَ ‌مِنْ ‌ذٰلِكَ، فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَيْنَ أَبُـوْكَ؟ فَـقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَيْـثُمَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ مُشْرِكٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ قَالَ: فَأَسْلَمَ الْأَعْرَابِيُّ بَعْدُ، وَقَالَ: لَقَدْ كَلَّفَنِيْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَـعَبًا، مَا مَرَرْتُ بِقَبْرِ كَافِرٍ إِلَّا بَشَّرْتُهُ بِالنَّارِ
অর্থ: হযরত সালিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একজন বেদুইন এসে প্রশ্ন করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। বর্তমানে তিনি কোথায়? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, জাহান্নামে। এতে লোকটি কিছুটা মর্মাহত হল। অতঃপর সে ব্যক্তি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার পিতা তিনি কোথায়? তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, তুমি যখন কোন মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। পরবর্তীতে লোকটি মুসলমান হয়ে গেল এবং বলল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন যখনই আমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করেছি তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিয়েছি। (ইবনে মাজাহ ১/৫০১: হাদীছ শরীফ নং ১৫৭৩)

এই বর্ণনাটি উল্লেখ করে হযরত আবুল আব্বাস শিহাবুদ্দীন আহমদ ইবনে আবু বকর ইবনে ইসমাঈল রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত ৮৪০ হিজরী) বলেন,
هٰذَا إِسْنَادٌ صَحِيْحٌ رِجَالُهٗ ثِقَاتٌ
এই বর্ণনাটির সনদ সহীহ, বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। (মিছবাহুস জুজাজাত ফি যাওয়াদ ইবনে মাজাহ ২/৪৩)

বর্ণনা নং ৩ঃ
আরো একটি সহীহ সনদে হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে,
عَنْ عَمِّهِ لَقِيْطِ بْنِ عَامِرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، أَنَّهٗ خَرَجَ وَافِدًا إِلٰى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ نُـهَيْكُ بْنُ عَاصِمِ بْنِ مَالِكِ بْنِ الْمُنْـتَفِقِ فَـقَالَ: قَدِمْنَا الْمَدِيْـنَةَ لِاِنْسِلَاخِ رَجَبٍ فَصَلَّيْـنَا مَعَهُ صَلَاةَ الْغَدَاةِ، فَـقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي النَّاسِ خَطِيْـبًا، فَذَكَرَ الْحَدِيْثَ إِلٰى أَنْ قَالَ: فَـقُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ ‌صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَلْ ‌أَحَدٌ ‌مِمَّنْ ‌مَضَى ‌مِنَّا ‌فِيْ ‌جَاهِلِيَّةٍ مِّنْ خَيْرٍ؟ فَـقَالَ رَجُلٌ مِنْ عَرَضِ قُـرَيْشٍ: إِنَّ أَبَاكَ الْمُنْـتَفِقَ فِي النَّارِ، فَكَأَنَّهٗ وَقَعَ حَرٌّ بَيْنَ جِلْدِ وَجْهِيْ وَلَحْمِيْ مِمَّا قَالَ لِأَبِيْ عَلَى رُؤُوسِ النَّاسِ، فَـهَمَمْتُ أَنْ أَقُـوْلَ: وَأَبُوْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ ثُمَّ نَظَرْتُ فَإِذَا الْأُخْرَى أَجْمَلُ فَـقُلْتُ: وَأَهْلُكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَـقَالَ: مَا أَتَـيْتَ عَلَيْهِ مِنْ قَـبْرِ قُـرَشِيٍّ أَوْ عَامِرِيٍّ مُشْرِكٍ فَـقُلْ: أَرْسَلَنِيْ إِلَيْكَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَبْشِرْ بِمَا يَسُوْءُكَ
হযরত লাকিত ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, একবার তিনি একটি প্রতিনিধি দলের সাথে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র দরবার শরীফে আসলেন। উনার সাথে তখন নুহাইক বিন আসিম বিন মালিক বিন মুন্তাফিক ছিলেন। তিনি বলেন আমরা রজব মাসে পবিত্র মদিনা শরীফে পৌঁছলাম। অতঃপর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ফজরের নামায পড়লাম। নামায শেষে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি লোকদের প্রতি খুতবা মুবারক দিতে দাঁড়ালেন। (অতঃপর বর্ণনাকারী হাদীছ শরীফের বাকী অংশ বর্ণনা করলেন) অবশেষে বলেন- তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের মধ্যে যারা জাহিলিয়াত যুগে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মধ্যে কোন ভাল লোক আছে কি? তখন কুরাইশ বংশীয় এক ব্যক্তি বলল, তোমার পিতা মুন্তাফিক জাহান্নামী। উপস্থিত জনতার সামনে আমার পিতা সম্বন্ধে এমন মন্তব্য করায় আমার চেহারায় আগুন ঝরতে লাগল, কারণ সে সবার সামনে আমার পিতার ব্যাপারে এমন কথা বলেছে।
আমি প্রায় বলে ফেলেছিলাম: আর আপনার পিতা, হে আল্লাহর রসূল ছলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?
কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম অন্যভাবে বলা উত্তম হবে। তাই আমি বললাম: আপনার পরিবার (আত্মীয়স্বজন) সম্পর্কে কী, হে আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?
তখন তিনি বললেন: তুমি যখনই কোনো কুরাইশি বা আমিরি মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে যাবে, তখন বলবে “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন; সুতরাং এমন কিছুর সুসংবাদ গ্রহণ কর যা তোমাকে কষ্ট দেবে।”(মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন ৪/৬০৫: হাদীছ শরীফ ৮৬৮৩)

এ হাদীছ শরীফখানা উল্লেখ করে ইমাম হাকীম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
هٰذَا حَدِيْثٌ جَامِعٌ فِي الْبَابِ صَحِيْحُ الْإِسْنَادِ، كُلُّهُمْ مَدَنِيُّـوْنَ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ
এই হাদীছ শরীফখানা এই অধ্যায়ে জমাকৃত সকল হাদীছ শরীফের চাইতে সহীহ সনদে বর্নিত। বর্ণনাকারীগণ সকলেই মদীনা শরীফের। যদিও বুখারী মুসলিম শরীফে তা বর্ণিত হয়নি। (মুস্তাদরাক আলান সহীহাইন ৪/৬০৫)

বর্ণনা নং ৪ঃ
ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন কিতাবে বিশুদ্ধ সনদে একটি হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেছেন,
فَـقَالَ رَجُلٌ شَابٌّ مِّنَ الْأَنْصَارِ لَمْ أَرَ رَجُلًا كَانَ أَكْثَـرَ سُؤَالًا لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَرَى أَبَـوَاكَ فِي النَّارِ فَـقَالَ: ‌مَا ‌سَأَلْتُـهُمَا ‌رَبِّيْ ‌فَـيُـعْطِيْنِيْ ‌فِيْهِمَا وَإِنِّيْ لَقَائِمٌ يَوْمَئِذٍ الْمَقَامَ الْمَحْمُوْدَ
অর্থ: হযরত ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, একদা এক আনসারী যুবক হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, (ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন তার চেয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অধিক প্রশ্ন করতে আর কাউকে দেখিনি) ইয়া রসূলাল্লাহ ইয়া হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কি মনে করেন, আপনার পিতা-মাতা জাহান্নামী? (নাউযুবিল্লাহ!) তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, আমি উনাদের বিষয়ে আমার মহান রব উনার নিকট যা চাইব আমাকে তাই দেয়া হবে। আর সেদিন আমি মাকামে মাহমূদে অবস্থান মুবারক করব। (মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন ২/৩৯৬: হাদীছ ৩৩৮৫)

এ পবিত্র হাদীছ শরীফখানা উল্লেখ করে ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
هٰذَا حَدِيْثٌ صَحِيْحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ
এই পবিত্র হাদীছ শরীফখানা সহীহ সনদে বর্ণিত যদি বুখারী মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়নি। (মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন ২/৩৯৬)

এই হাদীছ শরীফের মাধ্যমে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার পিতা মাতার সুমহান মর্যাদা মুবারক প্রকাশ করে দিলেন। স্পষ্টই বুঝিয়ে দিলেন সবোর্চ্চ মাকাম মুবারকে অবস্থান যিনি করছেন তিনি হচ্ছেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উনার সম্মানিত পিতা মাতা উনারাও সবোর্চ্চ মাকাম মুবারকেই অবস্থান করছেন। সুবহানাল্লাহ!

* আরো একটি সমর্থক বর্ণনা:
আমরা ১ম পর্বে দেখেছি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির পরিবর্তে আরো শক্তিশালী রাবি হযরত মা’মার বিন রশিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির সূত্রে সঠিক মতনে পবিত্র হাদীছ শরীফ আছে। এখানে আমরা আরেকটি বর্ণনা দেখাবো যেখানে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীছ শরীফখানা হচ্ছে-
أَخْبَـرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ مَعْمَرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنِ الزُّهْرِيِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ৃ. قَالَ: هَلَكَ أَبُـوْكَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَمَدْخَلُهُ النَّارُ، قَالَ: فَـغَضِبَ الْأَعْرَابِيُّ، وَقَالَ: فَأَيْنَ مَدْخَلُ أَبِيْكَ؟ فَـقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَيْثُ مَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ كَافِرٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একজন বেদুইন এসে বললো, ......আমার পিতা কি জাহিলিয়াতে মৃত্যুবরণ করেছে? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, হ্যাঁ। এতে লোকটি কিছুটা মর্মাহত হল। অতঃপর সে ব্যক্তি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার সম্মানিত পিতা আলাইহিস সালাম তিনি কোথায়? তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, তুমি যখন কোন মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। (দলীল: মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১০/৪৫৪, হাদীছ শরীফ ১৯৬৮৭)

এই বর্ণনার সনদ কিন্তু ভিন্ন। অনেক বলতে পারে এই সনদতো ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহির মুরসাল। ইমাম যুহরীর মুরসাল নিয়ে তো অভিযোগ আছে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো যায় যে, আমাদের উপরে উল্লেখিত ১নং বর্ণনায় হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে মুত্তাসিল সনদ আছে। যা নিম্নরূপ-
عَنِ الزُّهْرِيِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَبِيْهِ

সূতরাং মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাকের বর্ণনায় হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহির মুরসাল কোন সমস্যা নয়। কারণ এখানে হযরত আব্দুর রাজ্জাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমাম হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন। এই পর্যন্ত সবাই সিক্বাহ। আর ১ নং বর্ণনায় ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আমের ইবনে সা’দ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি উনার পিতা হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এখানে হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা তায়ালা আনহু পর্যন্ত কোন ইরসাল নেই বরং মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত সেই সাথে সকল রাবী সিক্বাহ। সুতরাং এই বর্ননাও সহীহ।

আমরা উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখতে পেলাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামের সুমহান শান মুবারকের খিলাফ ‘মুসলিম শরীফে’ বর্ণিত বর্ণনাটি মাত্র একটি বিচ্ছিন্ন সনদে এসেছে। অথচ তার বিপরীতে ৫ জন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম থেকে বর্ণনা এসেছে যেখানে সেই আপত্তিকর কথাটির লেশমাত্রও নেই। ৫ জন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হচ্ছেন,
১) হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
২) হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৩) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৪) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৫) হযরত লাকিত ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।

সূতরাং যেখানে এতগুলো বিশুদ্ধ সনদে হাদীছ শরীফ পাওয়ার পরও শেষ বয়সে স্মৃতিশক্তি হারানো ‘মুসলিম শরীফে’ হযরত হাম্মাদ ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বিছিন্ন একটি বর্ণনাকে পুঁজি করে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামের শান মুবারকের খিলাফ কথা বলা চরম গোমরাহীর বা ভ্রষ্টতার অন্তর্ভূক্ত।

আর উছূল হচ্ছে,
وَالْحَدِيثُ الصَّحِيحُ إِذَا عَارَضَهُ أَدِلَّةٌ أُخْرَى هِيَ أَرْجَحُ مِنْهُ وَجَبَ تَأْوِيلُهُ وَتَـقْدِيمُ تِلْكَ الْأَدِلَّةِ عَلَيْهِ كَمَا هُوَ مُقَرَّرٌ فِي الْأُصُوْلِ
অর্থ: যখন কোন সহিহ হাদীছ শরীফের সাথে অন্য কোন দলিল সাংঘর্ষিক হয় তখন সে ক্ষেত্রে সহিহ হাদীছ শরীফকে প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। এটা উছূল সমূহের একটি নীতি। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৪)

সূতরাং ৫টি ছহীহ হাদীছ শরীফের মোকাবিলায় একটি বিচ্ছিন্ন মতের কোন ভিত্তিই থাকে না আর সর্বোপরি এটা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইজ্জত ও সম্মানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে বিষয়টা আরো ভিত্তিহীন হয়।

সূত্র উল্লেখের গুরুত্ব: ইলমী আমানতদারির এক অনন্য শিক্ষা

 সূত্র উল্লেখের গুরুত্ব: ইলমী আমানতদারির এক অনন্য শিক্ষা



হযরত শায়খ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন’-এ হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মধ্যকার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার বর্ণনা করেছেন।

একবার হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি অভিযোগ করেন যে, হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ’ গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিভিন্ন রচনা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন; কিন্তু সে বিষয়ে কোথাও কোনো সূত্র-উল্লেখ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি। হযরত সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দৃষ্টিতে এটি ছিল জ্ঞানচর্চার নীতিমালার পরিপন্থী এবং খিয়ানতের পর্যায়ের একটি গুরুতর অভিযোগ ।

পরবর্তীতে বিষয়টি ফয়সালার উদ্দেশ্যে তৎকালীন শায়খুল ইসলাম হযরত যায়নুদ্দীন যাকারিয়া আনসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট উপস্থাপিত হয়। সেখানে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করেন।
উল্লেখযোগ্য অভিযোগগুলোর একটি ছিল এই যে, ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ’ গ্রন্থে ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বরাতে কয়েকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেগুলো ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কোন মূল গ্রন্থে বিদ্যমান তা যেন হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যেন প্রদর্শন করেন। কিন্ত হযরত কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তা করতে সক্ষম হননি।

এ পর্যায়ে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, উক্ত বর্ণনাগুলো প্রকৃতপক্ষে হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করেছেন; আর তিনি নিজে সেগুলো ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন। অতএব, হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উচিত ছিল এভাবে উল্লেখ করা যে, “হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বরাতে এ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।” এতে যেমন উনার গবেষণাগত অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা হতো, তেমনি নকলের অভিযোগ থেকেও তিনি মুক্ত থাকতেন।

বর্ণনা অনুযায়ী, এ ঘটনার পর হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত মর্মাহত অবস্থায় মজলিস ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বহু চেষ্টা করেন হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মনঃকষ্ট দূর করে উনার সন্তুষ্টি অর্জনের।
অবশেষে একদিন তিনি মিসর নগরী থেকে পদব্রজে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বাসভবনে উপস্থিত হন। দরজায় করাঘাত করলে ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “কে?”
তিনি উত্তর দেন:
“আমি আহমদ। আমি খালি পায়ে ও খালি মাথায় আপনার দরজায় উপস্থিত হয়েছি, যেন আপনার অন্তরের কষ্ট দূর হয় এবং আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন।”
তখন হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ভেতর থেকেই উত্তর দেন:
“আমি আমার অন্তর থেকে সমস্ত অভিযোগ দূর করে ফেলেছি।”
কিন্তু এরপরও তিনি দরজা আর খোলেননি এবং হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও করেননি।

এখানে অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে। একজন গবেষক অনেক অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটা লেখা লিখেন। অনলাইনের যুগে এক ক্লিকে লেখাটা হয়তো আপনার ক্লিপবোর্ডে চলে আসে কিন্তু ওই লিখাটার পেছনে একটা গল্প থাকে। মূল লেখকের অসংখ্য নির্ঘুম রাত জাগা প্রচেষ্টা, বহু কষ্টে মেরুদণ্ড ব্যাথা করে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে দলীল অনুসন্ধান করা, একনাগাড়ে বইয়ের পাতায় তাকিয়ে থেকে দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে ফেলা, বছরকে বছর ব্যয় করে ফলাফল নিয়ে আসা। কার্টেসি ছাড়া একটা লেখা প্রচার করলে এ গল্প আপনি জানবেন না।
যেখান থেকেই তিনি উপকৃত হোন না কেন, যথাযথ সূত্র-উল্লেখের মাধ্যমে সেই ব্যক্তির অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি মানুষের অবদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে প্রকৃত অর্থে ইলমের হকও আদায় করতে পারে না। গবেষণার প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল নতুন তথ্য উপস্থাপনের মধ্যে নয়, বরং অন্য গবেষকদের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের মধ্যেও নিহিত।

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পবিত্র মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে আল্লাহ পাকের আয়োজিত অনুষ্ঠান

পবিত্র মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়ে আল্লাহ পাকের আয়োজিত অনুষ্ঠানের কিছু নমুনা এখানে দেখা যায়।





وَأخرج ابو نعيم عَن عَمْرو بن قُتَيْبَة قَالَ سَمِعت أبي وَكَانَ من أوعية الْعلم قَالَ لما حضرت ولادَة آمِنَة قَالَ الله لملائكته افتحوا ابواب السَّمَاء كلهَا وأبواب الْجنان كلهَا وامر الله الْمَلَائِكَة بالحضور فَنزلت تبشر بَعْضهَا بَعْضًا وتطاولت جبال الدُّنْيَا وَارْتَفَعت الْبحار وتباشر أَهلهَا فَلم يبْق ملك إِلَّا حضر وَأخذ الشَّيْطَان ‌فَغَلَّ ‌سبعين ‌غلا ‌وَأُلْقِي ‌منكوسا ‌فِي ‌لجة ‌الْبَحْر الخضراء وغلت الشَّيَاطِين والمردة وألبست الشَّمْس يَوْمئِذٍ نورا عَظِيما وأقيم على رَأسهَا سَبْعُونَ الف حوراء فِي الْهَوَاء ينتظرون ولادَة مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَكَانَ قد أذن الله تِلْكَ السّنة لِنسَاء الدُّنْيَا أَن يحملن ذُكُورا كَرَامَة لمُحَمد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وان لَا تبقى شَجَرَة إِلَّا حملت وَلَا خوف إِلَّا عَاد أمنا فَلَمَّا ولد النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم امْتَلَأت الدُّنْيَا كلهَا نورا وتباشرت الْمَلَائِكَة وَضرب فِي كل سَمَاء عَمُود من زبرجد وعمود من ياقوت قد استنار بِهِ فَهِيَ مَعْرُوفَة فِي السَّمَاء قد رَآهَا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لَيْلَة الْإِسْرَاء قيل هَذَامَا ضرب لَك استبشارا بولادتك وَقد انبت الله لَيْلَة ولد على شاطئ نهر الْكَوْثَر سبعين الف شَجَرَة من الْمسك الأذفر جعلت ثمارها بخور أهل الْجنَّة وكل اهل السَّمَوَات يدعونَ الله بالسلامة ونكست الْأَصْنَام كلهَا وَأما اللات والعزى فَإِنَّهُمَا خرجا من خزانتهما وهما يَقُولَانِ وَيْح قُرَيْش جَاءَهُم الْأمين جَاءَهُم الصّديق لَا تعلم قُرَيْش مَاذَا اصابها وَأما الْبَيْت فأياما سمعُوا من جَوْفه صَوتا وَهُوَ يَقُول الْآن يرد عَليّ نوري الْآن يجيئني زواري الْآن أطهر من أنجاس الْجَاهِلِيَّة أيتها الْعُزَّى هَلَكت وَلم تسكن زَلْزَلَة الْبَيْت ثَلَاثَة ايام ولياليهن وَهَذَا اول عَلامَة رَأَتْ قُرَيْش من مولد رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم
হযরত আমর ইবনে কুতাইবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা ছিলেন একজন ইলমে দীনের ভাণ্ডার বিশেষ। আমি তার নিকট শুনেছি যে, হযরত উম্মু রসূলিনা আমিনা আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র রেহেম শরীফ থেকে যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাশরীফ নেয়ার সময় উপনীত হলো, তখন মহান আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, তোমরা সমস্ত আকাশের দরজাগুলো এবং জান্নাতসমূহের দরজাগুলো খুলে দাও। আর ফেরেশতাদেরকে , উনার খিদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। ফেরেশতারা দুনিয়ায় অবতরণ করে পরস্পর সুসংবাদ বিনিময় করতেন। দুনিয়ার পাহাড় পর্বতগুলো মাথা উঁচু করে দাড়াল এবং সাগর ও নদীনালায় উঠল আনন্দের ঢেউ। তারা পরস্পর তার অধিবাসীদেরকে দিতে লাগল সুসংবাদ। সবুজ আকাশেরও কিছু অবশিষ্ট রইল না। সেখানেও চলল শুভ সংবাদের আদান প্রদান। আকাশের ফেরেশতারা শয়তানকে পাকড়াও করে সত্তরটি জিঞ্জির দ্বারা বেঁধে সাগরের তলদেশে অধঃমুখে নিক্ষেপ করেন। আর অন্যান্য সব শয়তানকেও জিঞ্জির দ্বারা বেঁধে রাখা হয়। ঐদিন সূর্যকে বিরাট এক নূরানী গহনা পরিধান করানো হয়। আর সত্তর হাজার বেহেশতের হুর হযরত রাসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মগ্রহণের অপেক্ষায় বায়ুমণ্ডলে থাকে দণ্ডায়মান। আল্লাহ পাক দুনিয়ার সমস্ত নারীদেরকে ঐ বছর পুত্র সন্তান জন্ম দেয়ার নির্দেশ দেন। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আরব দেশ ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। এবং ভয়ভীতি বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের দিন সারা পৃথিবী আল্লাহ তাআলার কুদরতি নূরে ভরপুর হয়ে ওঠে। আর ফেরেশতারা হয় খুশীতে আত্মহারা। তারা প্রত্যেক আকাশে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা এক একটি স্তম্ভ গড়ে তোলে, যা ঝলমল করতে থাকে। সেগুলো আকাশে প্রসিদ্ধ স্তম্ভ। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেন। উনাকে বলা হয় যে, এসব স্তম্ভ আপনার জন্মের স্মৃতিরূপে গড়া হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের রাতে আল্লাহ তাআলা হাউযে কাওছারের তীরে সত্তর হাজার মিশুকের বৃক্ষ উদগত করেন, যার ফলফলাদি হবে জান্নাতবাসীদের ধূপবাতি। ঐ সমস্ত আকাশবাসী আল্লাহ তাআলাকে আস্‌সালাম ও আস্‌সালাম নামে ডাকতে থাকেন। ঐদিন সমস্ত প্রতিমাগুলো আপন থেকে ভূলুণ্ঠিত হয়। মক্কার লাত ও উজ্জা প্রতিমাদ্বয় নিজ নিজ অবস্থান থেকে দূরে সরে পড়ে। হযরত আল আমীন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শুভাগমন হয়েছে। তাদের কাছে সত্যবাদীর আগমন ঘটেছে। কুরাইশরা (কাফিররা) জানে না যে, ভবিষ্যতে তাদের জীবনে কি দুর্দশা নেমে আসছে। ঐদিন কাবা ঘরের অভ্যন্তর থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত একটি আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল, সে বলছিল আমার নূর আমার কাছে ফিরে এসেছে। এখন আমার যিয়ারতকারী এসেছে। এখন আমাকে জাহেলিয়াতের অপবিত্রতা থেকে পবিত্রকারীর আগমন ঘটেছে। হে উজ্জা! তোমার ধ্বংস অনিবার্য। ঐ সময় তিনদিন তিনরাত পর্যন্ত কাবা ঘর থর থর করে কাঁপছিল। এ সময়টিতে সে স্থির ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণের এ প্রথম আলামতটি কুরাইশরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল
(দলীল: আল খাসায়িসুল কুবরা ১ম খন্ড ১১৭-১১৮)
যদি কেউ বুঝে তাহলে পবিত্র মীলাদ শরীফের অনেক দলীল আছে এই একটা হাদীছ শরীফের মধ্যে। আমি শুধু একটা পয়েন্ট উল্লেখ করবো-
وَضرب فِي كل سَمَاء عَمُود من زبرجد وعمود من ياقوت قد استنار بِهِ فَهِيَ مَعْرُوفَة فِي السَّمَاء قد رَآهَا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لَيْلَة الْإِسْرَاء قيل هَذَامَا ضرب لَك استبشارا بولادتك وَقد انبت الله لَيْلَة ولد على شاطئ نهر الْكَوْثَر سبعين الف شَجَرَة من الْمسك الأذفر جعلت ثمارها بخور أهل الْجنَّة
তারা প্রত্যেক আকাশে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা এক একটি স্তম্ভ গড়ে তোলে, যা ঝলমল করতে থাকে। সেগুলো আকাশে প্রসিদ্ধ স্তম্ভ। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেন। উনাকে বলা হয় যে, এসব স্তম্ভ আপনার জন্মের স্মৃতিরূপে গড়া হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের রাতে আল্লাহ তাআলা হাউযে কাওছারের তীরে সত্তর হাজার মিশকের বৃক্ষ উদগত করেন, যার ফলফলাদি হবে জান্নাতবাসীদের ধূপবাতি।’
লক্ষ্য করুন, বলা হচ্ছে- পবিত্র বিলাদত শরীফের রাতে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা উজ্জল একটি স্তম্ভ গড়ে তোলা হয়। আর এই স্মৃতি চিহৃ স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মের ৫১ বছর পর মিরাজ শরীফে গিয়ে দেখতে পান। এ থেকে প্রমাণ হয় স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক তিনিও বিলাদত শরীফের স্মৃতি চিহৃ রেখে দিয়েছেন।
এবং পবিত্র বিলাদত শরীফের রাতে, বিলাদত শরীফ উপলক্ষে হাউজে কাউসারের তীরে সত্তর হাজার মিশকের বৃক্ষ সৃষ্টি করা হয় যা জান্নাতবাসীদের সুগন্ধি হিসাবে থাকবে।
কুলকায়িনাত সৃষ্টি জগতে মীলাদ শরীফের আয়োজন ও স্মৃতি চিহৃ অথচ উম্মত দাবিদার আজ তা নিয়ে দ্বিধা দন্দে জর্জরিত।