সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পবিত্র মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে আল্লাহ পাকের আয়োজিত অনুষ্ঠান

পবিত্র মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়ে আল্লাহ পাকের আয়োজিত অনুষ্ঠানের কিছু নমুনা এখানে দেখা যায়।





وَأخرج ابو نعيم عَن عَمْرو بن قُتَيْبَة قَالَ سَمِعت أبي وَكَانَ من أوعية الْعلم قَالَ لما حضرت ولادَة آمِنَة قَالَ الله لملائكته افتحوا ابواب السَّمَاء كلهَا وأبواب الْجنان كلهَا وامر الله الْمَلَائِكَة بالحضور فَنزلت تبشر بَعْضهَا بَعْضًا وتطاولت جبال الدُّنْيَا وَارْتَفَعت الْبحار وتباشر أَهلهَا فَلم يبْق ملك إِلَّا حضر وَأخذ الشَّيْطَان ‌فَغَلَّ ‌سبعين ‌غلا ‌وَأُلْقِي ‌منكوسا ‌فِي ‌لجة ‌الْبَحْر الخضراء وغلت الشَّيَاطِين والمردة وألبست الشَّمْس يَوْمئِذٍ نورا عَظِيما وأقيم على رَأسهَا سَبْعُونَ الف حوراء فِي الْهَوَاء ينتظرون ولادَة مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَكَانَ قد أذن الله تِلْكَ السّنة لِنسَاء الدُّنْيَا أَن يحملن ذُكُورا كَرَامَة لمُحَمد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وان لَا تبقى شَجَرَة إِلَّا حملت وَلَا خوف إِلَّا عَاد أمنا فَلَمَّا ولد النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم امْتَلَأت الدُّنْيَا كلهَا نورا وتباشرت الْمَلَائِكَة وَضرب فِي كل سَمَاء عَمُود من زبرجد وعمود من ياقوت قد استنار بِهِ فَهِيَ مَعْرُوفَة فِي السَّمَاء قد رَآهَا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لَيْلَة الْإِسْرَاء قيل هَذَامَا ضرب لَك استبشارا بولادتك وَقد انبت الله لَيْلَة ولد على شاطئ نهر الْكَوْثَر سبعين الف شَجَرَة من الْمسك الأذفر جعلت ثمارها بخور أهل الْجنَّة وكل اهل السَّمَوَات يدعونَ الله بالسلامة ونكست الْأَصْنَام كلهَا وَأما اللات والعزى فَإِنَّهُمَا خرجا من خزانتهما وهما يَقُولَانِ وَيْح قُرَيْش جَاءَهُم الْأمين جَاءَهُم الصّديق لَا تعلم قُرَيْش مَاذَا اصابها وَأما الْبَيْت فأياما سمعُوا من جَوْفه صَوتا وَهُوَ يَقُول الْآن يرد عَليّ نوري الْآن يجيئني زواري الْآن أطهر من أنجاس الْجَاهِلِيَّة أيتها الْعُزَّى هَلَكت وَلم تسكن زَلْزَلَة الْبَيْت ثَلَاثَة ايام ولياليهن وَهَذَا اول عَلامَة رَأَتْ قُرَيْش من مولد رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم
হযরত আমর ইবনে কুতাইবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা ছিলেন একজন ইলমে দীনের ভাণ্ডার বিশেষ। আমি তার নিকট শুনেছি যে, হযরত উম্মু রসূলিনা আমিনা আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র রেহেম শরীফ থেকে যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাশরীফ নেয়ার সময় উপনীত হলো, তখন মহান আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, তোমরা সমস্ত আকাশের দরজাগুলো এবং জান্নাতসমূহের দরজাগুলো খুলে দাও। আর ফেরেশতাদেরকে , উনার খিদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। ফেরেশতারা দুনিয়ায় অবতরণ করে পরস্পর সুসংবাদ বিনিময় করতেন। দুনিয়ার পাহাড় পর্বতগুলো মাথা উঁচু করে দাড়াল এবং সাগর ও নদীনালায় উঠল আনন্দের ঢেউ। তারা পরস্পর তার অধিবাসীদেরকে দিতে লাগল সুসংবাদ। সবুজ আকাশেরও কিছু অবশিষ্ট রইল না। সেখানেও চলল শুভ সংবাদের আদান প্রদান। আকাশের ফেরেশতারা শয়তানকে পাকড়াও করে সত্তরটি জিঞ্জির দ্বারা বেঁধে সাগরের তলদেশে অধঃমুখে নিক্ষেপ করেন। আর অন্যান্য সব শয়তানকেও জিঞ্জির দ্বারা বেঁধে রাখা হয়। ঐদিন সূর্যকে বিরাট এক নূরানী গহনা পরিধান করানো হয়। আর সত্তর হাজার বেহেশতের হুর হযরত রাসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মগ্রহণের অপেক্ষায় বায়ুমণ্ডলে থাকে দণ্ডায়মান। আল্লাহ পাক দুনিয়ার সমস্ত নারীদেরকে ঐ বছর পুত্র সন্তান জন্ম দেয়ার নির্দেশ দেন। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আরব দেশ ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। এবং ভয়ভীতি বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের দিন সারা পৃথিবী আল্লাহ তাআলার কুদরতি নূরে ভরপুর হয়ে ওঠে। আর ফেরেশতারা হয় খুশীতে আত্মহারা। তারা প্রত্যেক আকাশে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা এক একটি স্তম্ভ গড়ে তোলে, যা ঝলমল করতে থাকে। সেগুলো আকাশে প্রসিদ্ধ স্তম্ভ। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেন। উনাকে বলা হয় যে, এসব স্তম্ভ আপনার জন্মের স্মৃতিরূপে গড়া হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের রাতে আল্লাহ তাআলা হাউযে কাওছারের তীরে সত্তর হাজার মিশুকের বৃক্ষ উদগত করেন, যার ফলফলাদি হবে জান্নাতবাসীদের ধূপবাতি। ঐ সমস্ত আকাশবাসী আল্লাহ তাআলাকে আস্‌সালাম ও আস্‌সালাম নামে ডাকতে থাকেন। ঐদিন সমস্ত প্রতিমাগুলো আপন থেকে ভূলুণ্ঠিত হয়। মক্কার লাত ও উজ্জা প্রতিমাদ্বয় নিজ নিজ অবস্থান থেকে দূরে সরে পড়ে। হযরত আল আমীন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শুভাগমন হয়েছে। তাদের কাছে সত্যবাদীর আগমন ঘটেছে। কুরাইশরা (কাফিররা) জানে না যে, ভবিষ্যতে তাদের জীবনে কি দুর্দশা নেমে আসছে। ঐদিন কাবা ঘরের অভ্যন্তর থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত একটি আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল, সে বলছিল আমার নূর আমার কাছে ফিরে এসেছে। এখন আমার যিয়ারতকারী এসেছে। এখন আমাকে জাহেলিয়াতের অপবিত্রতা থেকে পবিত্রকারীর আগমন ঘটেছে। হে উজ্জা! তোমার ধ্বংস অনিবার্য। ঐ সময় তিনদিন তিনরাত পর্যন্ত কাবা ঘর থর থর করে কাঁপছিল। এ সময়টিতে সে স্থির ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণের এ প্রথম আলামতটি কুরাইশরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল
(দলীল: আল খাসায়িসুল কুবরা ১ম খন্ড ১১৭-১১৮)
যদি কেউ বুঝে তাহলে পবিত্র মীলাদ শরীফের অনেক দলীল আছে এই একটা হাদীছ শরীফের মধ্যে। আমি শুধু একটা পয়েন্ট উল্লেখ করবো-
وَضرب فِي كل سَمَاء عَمُود من زبرجد وعمود من ياقوت قد استنار بِهِ فَهِيَ مَعْرُوفَة فِي السَّمَاء قد رَآهَا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لَيْلَة الْإِسْرَاء قيل هَذَامَا ضرب لَك استبشارا بولادتك وَقد انبت الله لَيْلَة ولد على شاطئ نهر الْكَوْثَر سبعين الف شَجَرَة من الْمسك الأذفر جعلت ثمارها بخور أهل الْجنَّة
তারা প্রত্যেক আকাশে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা এক একটি স্তম্ভ গড়ে তোলে, যা ঝলমল করতে থাকে। সেগুলো আকাশে প্রসিদ্ধ স্তম্ভ। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেন। উনাকে বলা হয় যে, এসব স্তম্ভ আপনার জন্মের স্মৃতিরূপে গড়া হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের রাতে আল্লাহ তাআলা হাউযে কাওছারের তীরে সত্তর হাজার মিশকের বৃক্ষ উদগত করেন, যার ফলফলাদি হবে জান্নাতবাসীদের ধূপবাতি।’
লক্ষ্য করুন, বলা হচ্ছে- পবিত্র বিলাদত শরীফের রাতে যবরজদ ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা উজ্জল একটি স্তম্ভ গড়ে তোলা হয়। আর এই স্মৃতি চিহৃ স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মের ৫১ বছর পর মিরাজ শরীফে গিয়ে দেখতে পান। এ থেকে প্রমাণ হয় স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক তিনিও বিলাদত শরীফের স্মৃতি চিহৃ রেখে দিয়েছেন।
এবং পবিত্র বিলাদত শরীফের রাতে, বিলাদত শরীফ উপলক্ষে হাউজে কাউসারের তীরে সত্তর হাজার মিশকের বৃক্ষ সৃষ্টি করা হয় যা জান্নাতবাসীদের সুগন্ধি হিসাবে থাকবে।
কুলকায়িনাত সৃষ্টি জগতে মীলাদ শরীফের আয়োজন ও স্মৃতি চিহৃ অথচ উম্মত দাবিদার আজ তা নিয়ে দ্বিধা দন্দে জর্জরিত।


১৫’শ খৃষ্টাব্দে এই উপমহাদেশে জাতীয়ভাবে জাঁকজমকভাবে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো

১৫’শ খৃষ্টাব্দে এই উপমহাদেশে জাতীয়ভাবে জাঁকজমকভাবে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো।

বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর সময় এই আমল এত ব্যাপকভাবে পালন হতো যে বাদশা মালেক মুজাফর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চাইতেও বেশি রাজকীয়ভাবে সেটাই মনে হয়।
বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত “বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস” বইয়ের ২য় খন্ডে ১৯৭ পৃষ্ঠায় তাকালে আমরা দেখতে পাই,




১) বাংলার মুসলমানগন অত্যান্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে ও ধুমধামের সাথে ঈদে মীলাদ পালন করতো।
২) নবাব এ দিনকে বিশেষ উৎসবের দিনে হিসাবে পালনের ব্যবস্থা করেন।
৩) রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম ১২ দিন পালনের ব্যবস্থা করেন।
৪) এ উপলক্ষে তিনি সম্পূর্ণ মুর্শিদাবাদ শহর ও পর্শ্ববর্তী এলাকা আলোকমালায় সজ্জিত করতেন।
৫) ১ লক্ষ মানুষ শুধু আলোক সজ্জার কাজে নিয়োজিত থাকতেন।
৬) কামান গর্জনের মাধ্যমে সড়ক ও নদীপথ আলোকিত হয়ে উঠতো।
৭) মুসলমান শাষনকর্তাগন ও জনসাধারনগন এই উপমাহাদেশব্যাপী ঈদে মীলাদ পালন করতো।
৮) আওলাদে রসূল ও আলেমদের উপহার দেয়া হতো।
৯) রাজ প্রসাধে রবিউল আউয়াল শরীফ মাসের ১ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত উলামায়ে কিরাম উনাদের মজলিস হতো।
১০) ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাদীছ শরীফ আলোচনা করতেন।
উপরোক্ত ঘটনা থেকেই প্রমাণ হয়, সেসময় এই্ উপমহাদেশে এত সমৃদ্ধশালী ছিলো তার মূল কারন ছিলো এত মর্যাদার সাথে ঈদে মীলাদে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সেসময় ১ টাকায় ৮মন চাল পাওয়া যেত। মানুষের কোন অভাব ছিলো না। মানুষজন সুখী ও সমৃদ্ধ ছিলো।
আর আজকে মানুষ এত আযাবে আছে তার কারন কি? কারন হচ্ছে ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় ওহাবী মতবাদ রেখে গেছে ঈমান ধ্বংস করার জন্য। তারা এখন পবিত্র এই আমলকে বিদয়াত হারাম ফতোয়া দেয়। নাউযুবিল্লাহ।
মানুষ যদি আবার সেই সমৃদ্ধ অর্জন করতে চায় তাহলে আবারো ঈদে মীলাদ পালন করতে হবে

আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাব নিয়ে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র

হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান শান মান মুবারক সমৃদ্ধ একখানা বিখ্যাত কিতাব হচ্ছে “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী সাইয়্যিদি উইলদি আদম”। বাতিল ফিরক্বার লোকেরা এই নির্ভরযোগ্য কিতাব নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। মিথ্যা বানোয়াট কথা বলে সাধারণ মানুষদের এই কিতাব ও এর দলীলসমূহের বিষয়ে ভুল বোঝাচ্ছে।

পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ বা পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর লিখিত অন্যতম একটি কিতাব হচ্ছে “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী সাইয়্যিদি উইলদি আদাম”। লেখক হচ্ছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ, পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বিশিষ্ট মুফতী, অসংখ্য কিতাবের মুছান্নিফ হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহতুল্লাহি আলাইহি তিনি। উক্ত কিতাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন সম্পর্কে হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম, হযরত তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম, মাযহাব উনার ইমাম ও বিখ্যাত অনেক আলিম উনাদের ক্বওল শরীফ বিদ্যমান রয়েছে। বিরোধিতাকারীদের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে এখানেই। কারণ এ কিতাবকে যদি মেনে নেয়া হয় তবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আর বিরোধিতা করার কোন অবকাশই থাকে না।
“নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাবটিকে জাল প্রমাণ করার জন্য মীলাদ শরীফ বিরোধি লোকেরা উঠে পরে লেগেছে। তারা এর জন্য ইবারত কারচুপী, জাল পান্ডুলিপী রচনাসহ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বই পুস্তক লিখছে। তেমনি একজন হচ্ছে তুরষ্কের আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ। এছাড়াও সৌদি আরবের আরো অনেক ওহাবী বিষয়টিতে সংযুক্ত হয়েছে। তারা প্রচার করছে মুহাদ্দিছ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাব লিখেননি বরং তিনি লিখেছেন “ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম”। এ মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ভয়ানক সব জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মীলাদ শরীফ বিষয়ে আরো একটি কিতাব লিখেছেন যার নাম হচ্ছে “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”। মীলাদ বিরোধি সম্প্রদায় প্রচার করছে এই “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবখানা হচ্ছে “ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাবের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৪৪১ হিজরী সালে আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ নামক জনৈক তুরস্কের ব্যক্তিটি “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবের তাহকীক লিখেছে এবং তার নাম দিয়েছে ‘মাওলুদে ইবনে হাজার মুখতাছারু মিন কিতাবি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলুদে সাইয়্যিদি উলদী আদম’। অর্থাৎ সে নিজ থেকেই ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছে ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাওলুদ নামক একটা কিতাব লিখেছেন যা ইতমামু নি’মাতুল কুবরার সংক্ষিপ্ত রূপ। আর এ জালিয়াতি ছাবিত করার জন্য সে যা করেছে তা দাজ্জালকেও হার মানায়।



আমাদের হাতে ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবের তিনটি হালেলেখা পাণ্ডুলীপি আছে। প্রতিটি নূসখাতেই ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির এই বক্তব্য রয়েছে,
كما جـمعت ذلك كتاب النعمة الكبري علي العالـم بـمولد سيد ولد ادم
অর্থ: ঐ সমস্ত বিষয়গুলো আমি একটি কিতাবে জমা করেছি যে কিতাবের আমি নাম রেখেছি “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম”।
অথচ আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ ‘মাওলুদে ইবনে হাজার মুখতাছারু মিন কিতাবি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলুদে সাইয়্যিদি উলদী আদম’ কিতাবে এই ইবারতে খেয়ানত ও কারচুপি করে লিখেছে,
كما جـمعت ذلك كتاب إتمام النعمة الكبري علي العالـم بـمولد سيد ولد ادم
লক্ষ্য করুন, এখানে إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটি ঢুকানো হয়েছে। যা ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের কোন একটি পান্ডুলিপীতে নেই। তাহলে এটা কেন ঢুকানো হলো?



কারন খুবই পরিষ্কার। আমরা মীলাদ শরীফ বিষয়ে হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের যে দলীল পেশ করি তা হযরত ইবনে হাজার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম’ নামক কিতাবে রয়েছে। আর ইতমামু নি’মাতুল কুবরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কিতাব। যা হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামে জাল করা হয়েছে বলে প্রমাণিত (এ বিষয়ে সামনে দলীল ভিত্তিক লেখ হবে)। সূতরাং মীলাদ বিরোধিদের জাল করা কিতাবকে মূল কিতাব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটি লাগিয়ে ইবনে হাজার রহমতুল্লাহির নামে জালিয়াতি ও চুরি করে ধরা পড়েছে।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে চুড়ান্ত, পরিপূর্ণ, পূর্ণকরন ইত্যাদি। কোন একজন লেখক যখন একটা কিতাব লিখবেন তখনি শুরুতেই কি চুড়ান্ত বা পরিপূর্ণ করে লেখার কোন কারন আছে? কিতাবাদি যারা বুঝেন তারা জানেন, একজন লেখক একটা কিতাব লেখার পর একটা সময় মনে করেন এই কিতাবে আরো কিছু দলীল সংযুক্ত করা দরকার তখন তিনি আগের কিতাবকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য ‘ইতমাম’ দিয়ে আরেকটা সংস্করন করেন। অথবা লেখক যদি চান আগের কিতাবের সংক্ষিপ্ত রূপ তৈরী করবেন তিনি তখন পরবর্তী একটা সময়ে গিয়ে মুখতাসার বা সংক্ষিপ্ত আকারে লিখেন। আর ক্ষেত্র বিশেষে এই কাজটাও স্বয়ং মূল লেখক করেন না বরং ভিন্ন কোন লেখক কাজটা করে থাকেন। শুরুতেই নতুন একটা কিতাবে ইতমাম লেখাটা হাস্যকর একটা বিষয়। আর হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ কাজটি করেনওনি তা শুরুতেই আমরা প্রমাণ করেছি।
তাহলে মীলাদ বিরোধী মতবাদের লোকেরা কেন এই কাজ করলো? ‘ইতমামু নি’মাতুল কুবরা’ কিতাব প্রচার করা এবং ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবে ইতমাম শব্দে ইবারত চুরি করে ঢোকানোর রহস্য কি?

রহস্য বুঝতে হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের ওই অংশের সম্পূর্ণ ইবারতখানা পড়লে বিষয়টা পানির মত পরিষ্কার বোঝা যাবে। ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির লিখিত ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের ২৫, ২৬ ও ২৭ পৃষ্ঠায় লিখেন,

من ذالك الا ماظهر عند حمله و قبيله ووقت ولادته وَفِيْ اَيَّامِ رَضَاعَتِه وَتَرْبِيَّتِه لكفي كَمَا جَـمَعْتُ ذٰلِكَ كِتَابَ "الِنعْمَةِ الْكُبْرٰي عَلَى الْعَالَـمِ بِـمَوْلِدِ سَيِّدِ وُلْدِ اٰدَمَ" بِاَسَانِيْدِه الَّتِيْ نَقَلَهَا اِئِمَّةُ السُّنَنِ وَاَحَدِيْثَ الْـمَوْصُوْفُوْنَ بِالْـحِفْظِ وَالْاِتْقَانِ وَالْـجَلَالَةِ وَالْبُرْهَانِ فِي الْقَدِيْـمِ وَالْـحَدِيْثِ مِـمَّا هُوَ سَالِـمٌ مِّنْ وَضْعِ الْوَضَاعِيْنَ وَاِنْتِحَالِ الْـمُلْحِدِيْنَ [وَالْـمُغْتَوِيْنَ] وَالْـمُفْتِرِيْنَ لَا كَاَكْثَرِ الْـمَوَالِيْدِ الَّتِيْ بِاَيْدِي النَّاسِ فَاِنَّ فِيْهَا كَثِرًا مِّنَ الْـمُوْضُوْعِ الْكَذِبِ الْـمُخْتَلِقِ الْـمَصْنُوْعِ لٰكِنَّ فِيْ ذٰلِكَ الْكِتَابِ بَسْط لَايُتَمَّ قِرَأَتُه فِىْ مَـجْلِسٍ وَاحِدٍ فَاخْتَصَرْتُه هُنَا بِـحَذْفِ اَسَانِيْدِه وَغَرَائِـبِه وَاقْتَصَرْتُ مِنْهُ عَلٰى مَا يُسَنِّدُه مُتَابِعاَوْ عَاضِد دَوْمَا لِلتَّسْهِيْلِ عَلَي الْـمَادِحِيْنَ
অর্থ : “হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার মহাসম্মানিত আম্মাজান আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র রেহেম শরীফে থাকা অবস্থায় যে মোজেজা প্রকাশিত হয়েছে, পবিত্র রেহেম শরীফে তাশরীফ নেয়ার পূর্বে, পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহনের সময়, দুধ মুবারক পান করার দিন সমূহে এবং প্রতিপালন মুবারক যে দিন সমূহে হয়েছেন সে সকল বিষয়ে সঠিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ঐ সমস্ত বিষয়গুলো আমি একটি কিতাবে জমা করেছি যে কিতাবের আমি নাম রেখেছি “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম”।
সনদসহ সে বিষয়গুলো সুনান ও হাদীছ শরীফের ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগন বর্ণনা করেছেন। যেসকল ইমামগন পূর্ণ মুখস্তশক্তি, দক্ষতা, মর্যাদাসম্পন্ন এবং নতুন ও পুরতন দলীল উপস্থাপনার গুণে গুনান্বিত। উক্ত কিতাবের বর্ণনাসমূহ মনগড়া বানোয়াটিদের বানোয়াটি থেকে, পথভ্রষ্টদের চুরি করা এবং প্রতারকদেরও প্রতারনামূলক বর্ণনা থেকে মুক্ত। মীলাদ শরীফ সংক্রান্ত উক্ত কিতাবের বর্ণনাসমূহ ওইরকম নয় যা মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে কেননা নিশ্চয়ই সেগুলোর বর্ণনা অধিকাংশ বানোয়াট, মিথ্যা রচিত, কৃত্রিম।
কিন্তু (সুনান এবং হাদীছ শরীফের ইমামগনের বর্ণিত) ওই সমস্ত কিতাব ব্যাপক ও বিস্তৃত, যা এক মজলিসে পাঠ করে শেষ করা যায় না। তাই আমি উক্ত বর্ণনাসমূহ থেকে সনদ ও দূর্বোধ্য বিষয়সমূহ বাদ দিয়ে ওখানে (আমার ঐ কিতাব আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ) সংক্ষিপ্ত করলাম। যেগুলো অন্য বর্ণনার সাথে সাদৃশ্য ও সমর্থিত, যাতে প্রশংসাকারীগণ অতি সহজে সর্বদা আমল করতে পারেন।”
এ ইবরত থেকে কি প্রমাণ হলো? প্রমাণ হলো, হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাদীছ শরীফ সম্বলিত আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাবটি গ্রহন করলে প্রমাণ হয়ে যায় এ কিতাবে বর্ণিত সকল বর্ণনা গ্রহনযোগ্য সনদে প্রাপ্ত, এবং প্রশংশিত। আর এটাই মীলাদ বিরোধীদের গাত্রদাহের কারন। বিষয়টাকে বিতর্কিত করার জন্য তারা দুইটা কাজ করেছে-
১) ইতমামু নি’মামতুল কুবরা নামক জাল একটা কিতাব রচনা করেছে।
২) মাওলিদুন্নবী নামক কিতাবের ইবারত কারচুপি করে সেখানে ইতমাম প্রতিস্থাপন করেছে। নাউযুবিল্লাহ
এর অকাট্য প্রমাণ হচ্ছে দারু কুতুব ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত ‘ইতমামু নি’মাতুল কুবরার’ টীকাকারী যেকিনা পাক্কা মীলাদ শরীফ বিরোধী। ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার ভূমিকায় সে লিখেছে,
ومن البدع التي انتشرت في زماننا الاحتفال بمولد الرسول قلي الله عليه وسلم وغيره من الموالد، ولو كانت هذه الموالد لها علاقة بالدين لذكرها الله سبحانه في القرآن الكريم، أو لفعله الرسول صلي الله عليه وسلم أو أحد من أصحابه رضوان الله عليهم، وإنما هذا الامر لم يظهر في عهد رسول الله صلي الله عليه وسلم ولا في عهد أصحابه ولا في عصر التابعين وتابعيهم، وإنما كان أول من ابتدع تلك الموالد هم الفاطميون في القرن الرابع الهجري
আমাদের যুগে যে বিদআতগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তার মধ্যে একটি হলো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ এবং অন্যান্য মীলাদ (জন্মোৎসব)-এর উদযাপন । যদি এসব মীলাদের কোনো ধর্মীয় ভিত্তি থাকত, তাহলে তা মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে উল্লেখ করতেন, অথবা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তা করতেন, কিংবা উনার কোনো ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম তা করতেন । অথচ হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের যুগে, এমনকি পরবর্তী তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের যুগেও এমন কিছু দেখা যায়নি । বরং এই ধরনের মীলাদ বা জন্মোৎসব সর্বপ্রথম চালু করেছিল ফাতেমীয় (শিয়া মতাবলম্বী) শাসকগোষ্ঠী, যারা চতুর্থ হিজরী শতকে এই বিদআতের সূচনা করে। (নাউযুবিল্লাহ)




উক্ত ভূমিকায় আরো লেখা আছে,
ومن ثم فإن عمل المولد من الامور المحدثة والبدع الضالة التي لا تمت إلي الاسلام،
"সুতরাং মীলাদ শরীফ উদযাপন একটি নব্যসৃষ্ট কাজ এবং পথভ্রষ্টকারী বিদআত, যার ইসলামের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।" (নাউযুবিল্লাহ)
আরেকটু সামনে অগ্রসর হয়ে ভূমিকাতে লেখা হয়েছে,
وهل الخلفاء الراشدون المأمور باتباع سنتهم، وهم أبو بكر وعمر وعشمان وعلي رضي الله عنهم اجمعين- سنوا الاحتفال بذكري مولد نبيهم صلي الله عليه وسلم؟ والجواب قطعا: لا، لا
আর সেই খলিফায়ে রাশিদীন যাদের সুন্নাহ অনুসরণ করার নির্দেশ রয়েছে তারা হলেন হযরত সিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম, হযরত ফারুকে আযম আলাইহিস সালাম, হযরত যুননুরাইন আলাইহিস সালাম, হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহি সালাম উনারা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিন পালন করার কোনো নিয়ম চালু করেছিলেন?
উত্তর নিশ্চিতভাবেই: না, কখনোই না। (নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ)


ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাব যে মূলত পবিত্র মীলাদ শরীফের পক্ষে লেখা হয়নি সেটা ভূমিকা থেকে দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত হলো। ইতমামু নিয়মাতুল কুবরা প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের জন্য বলা সহজ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি মীলদ বিরোধী ছিলেন। সেটা হলে প্রকৃত নিয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাবটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে, মানুষ আস্থা হারাবে। খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের কওল শরীফ গুলোর প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারাবে।
এখন ইতমামু নি’মাতুল কুবরা যা হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামে লেখা হয়েছে সেটার কি হাকীকত?

একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে, চোর চুরি করলে কিছু আলামত রেখে যায়। ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবটা যে হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির নামে জাল করা তার কিছু আলমত এই কিতাবের প্রথম ৪ লাইনেই পাওয়া গেছে। ইতমামু নি’মাতুল কুবরার ৪টি নুসখা পাশাপাশি রেখে প্রথম ৪ লাইনে ৭ টি ভুল পাওয়া যায়, যা এক নুসখার সাথে আরেক নুসখার ব্যাপক অমিল প্রমাণ করে। সেই সাথে এও প্রমাণ করে কারচুপি করতে গিয়ে কোন নুসখায় যে শব্দ আছে সেটা আরেক নুসখায় বাদ গেছে। কোনটাতে আবার বেশি কিছু ঢুকানো হয়েছে।
দারুল কুতব আল ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবের প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ আছে,
الفصل الاول في اصل عمل المولد اعلم انه لم ينقل عن احد من السلف من القرون الثلاثة التي شهد النبى صلى الله عليه وسلم بخيرتها، لكنها بدعة حسنة، لما اشتملت عليه من الاحسان الكثير للفقراء ومن قرأة القرآن اكثار الذكر والصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم واظهار السرور بمولده والفرح به صلى الله علیه وسلم




বাইতুল মোকাররমের বর্তমান খতীব আব্দুল মালেক নিজে পাণ্ডুলিপী প্রকাশ না করে কৌশলে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: উৎপত্তি, ভিত্তি ও আপত্তি’ নামক বইয়ের শেষে দারু কুতুবুল মিছরিয়ার যে পন্ডুলপিরি ছবি সংযুক্ত করেছে সেখানে যা উল্লেখ আছে,
الفصل الاول في اصل عمل المولد اعلم انه بدعة لانه لم ينقل عن احد من السلف من القرون الثلاثة التي شهد النبى صلى الله عليه وسلم بخيرتها لكنها بدعة حسنة لما اشتملت عليه من الاحسان الكثير للفقراء ومن قرأة القرآن اكثار الذكر والصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم واظهار السرور والفرح به صلى الله علیه وسلم
খুবই ভালো ভাবে খেয়াল করুন- এই নুসখায় اعلم انه এর পরে بدعة لانه শব্দটা ঢুকেছে যা দারু কুতুব আল ইলমিয়ার নুসখায় নেই। এরপর واظهار السرور এর পর দারু কুতুব আল ইলমিয়ার নুসখায় بمولده শব্দটি আছে অথচ দারু কুতুবুল মিছরিয়ার নুসখায় واظهار السرور শাব্দের পর بمولده বাদ দিয়ে দিয়েছে সেখানে শুধু السرور والفرح শব্দ লিখে দিয়েছে।


মিশর থেকে সংগৃহীত আরেকটি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবের ইবরাত জালিয়াতি করে এভাবে লেখা হয়েছে,
اظهار الفرح والسرور به صلى الله عليه وسلم والمحبة واغاظة اهل الزيغ والعناد
ভালো করে দেখুন , দারু কুতুব আল ইলমিয়া ও দারু কুতুবুল মিছরিয়া উভয় নুসখাতে اظهار শব্দের পর প্রথমে السرور লিখা আছে এর পর والفرح শব্দটি। অথচ মিশরের এই পান্ডুলপিীতে আগে والفرح শব্দটি লেখা আছে পরে السرور লিখা আছে। সেই সাথে اظهار الفرح والسرور به صلى الله عليه وسلم এই বাক্যের পর والمحبة শব্দটি যোগ করা হয়েছে যা আবার দারু কুতুব আল ইলমিয়া ও দারু কুতুবুল মিছরিয়ার কোন নুসখাতেই নেই।


আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর তার হাদীসের নামে জালিয়াতি বইয়ে মিশরের জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত পান্ডুলিপি নং ৪৪৯/ ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার দলীল দিয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে,
الفصل الأول في أصل عمل المولد. إعلم أنه بدعة لأنه لم ينقل عن أحد من السلف في القرون الثلاثة التي شهد النبي ﷺ بخيريتها؛ لكنها بدعة حسنة لما اشتملت عليه من الإحسان الكبير للفقراء ومن قراءة القرآن وإكثار الذكر والصلاة على النبي ﷺ..... إذا كان أهل الصليب اتخذوا ليلة مولد نبيهم عيدا أكبر فأهل الإسلام أولى بذلك وأجدر...


যা উপরের ৩ টা পান্ডুলিপির সাথেও মিলে না। আগের গুলাতে আছে من القرون الثلاثة আর এখানে আছে في القرون الثلاثة, আগের পান্ডুলিপিতে আছ الاحسان الكثير আর এখানে আছে الإحسان الكبير
কত আশ্চর্যের বিষয়! ৪ টি পান্ডুলিপীর মধ্যে মাত্র প্রথম ৪ টা লাইন লিখতে গিয়ে সাতটি কারচুপি করেছে। এ থেকে কি বোঝা যায়? কত কাঁচা হাতের চুরি। মূলত ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাব হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখেন নাই। এটা উনার নামে জাল করা হয়েছে ও প্রচার করা হচ্ছে মূলত নিয়মাতুল কুবরা আলাল আলামকে প্রশ্ন বিদ্ধ করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম, হযরত তাবেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও মাযহাবের ইমামগন উনারা যে পালন করেছেন সেটা ধামাচাপা দেয়া। তারা বিগত বেশ কয়েক বছর মূল নিয়মাতুল কুবরাকে জাল বানানোর জন্য উঠে পরে লেগেছিলো, অথচ আল্লাহ পাক তাদের মিথ্যা প্রচার পছন্দ করেন নাই। প্রমান হয়ে গেলো তাদের ইতমামু নিয়মাতুল কুবরাই মূলত জাল। এভাবেই সত্য মিথ্যার পার্থক্য চিরকাল হয়েছে, এখনো হলো।
বিঃদ্রঃ আমার কাছে জাল ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার আরেকটা হস্তলিখিত পান্ডুলিপি আছে, মাঝখানে লেখালেখি থেকে দূরে থাকায় কোথায় রাখছি খুঁজে পাচ্ছি না। আছে কোথাও খুঁজে বের করতে হবে। সেখানেও আরো পার্থক্য আছে। প্রথম পৃষ্ঠার ৪ লাইনের মধ্যে এত ক্যাচাল সম্পূর্ণ বই মিলালে কি হবে ভেবে দেখেছেন? সে কাজও করবো ইনশাআল্লাহ।

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

৮ম হিজরী শতকে আলজেরিয়াতে রাজকীয়ভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন

 ইতিপূর্বে ৮ম হিজরী শতকে আলজেরিয়াতে রাজকীয়ভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন নিয়ে আলোচনা করেছি। হযরহ ইউসুফ নাবেহানী রহমতুল্লাহি আলাইহির কিতাব থেকে সংক্ষেপে। আজকের লেখায় বিস্তারিত সেই মাহফিলের বিবরন দেয়া হবে, যা পড়লে বুঝতে পারবেন সেই সময় কতটা গুরুত্ব ও সম্মানের সাথে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হতো।



হযরত শিহাবুদ্দীন আবুল আব্বাস আহমদ ইবন মুহাম্মদ আল মাক্কারী আত তিলমিসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ১০৪১ হিজরী) তিনি একখানা গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন যার নাম নাফহুত্ ত্বীব মিন গুস্নিল আন্দালুসির রত্বীব ওয়া যিকরু ওয়াযীরিহা লিসানুদ্দীন ইবনিল খতীব। কিতাবখানা আন্দালুসের ইতিহাস, সভ্যতা, সাহিত্য, আলেম-উলামা, কবি, নগর, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং মুসলিম আন্দালুসের ঐতিহ্যের একটি বিশাল সংকলন। এই কিতাবে তিনি আলজেরিয়াতে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের রাজকীয় বর্ণণা দিয়েছেন-

وقد حذا حذوها الفقيه الكاتب أبوزكريا يحيى بن خلدون أخو قاضي القضاة ولي الدين بن خلدون صاحب التاريخ، فقال في مولد عام ثمانية وسبعين وسبعمائة، واستطرد لمدح السلطان أبي حموموسى صاحب تلماسن الذي تقدم ذكره قريباً

আর তাঁর অনুসরণ করেছিলেন ফকীহ ও লেখক আবু যাকারিয়্যা ইয়াহইয়া ইবনু খালদূন যিনি ইতিহাসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থের রচয়িতা কাজীউল কুযাত ওয়ালিয়ুদ্দীন ইবনু খালদূনের ভাই। তিনি ৭৭৮ হিজরির মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুষ্ঠানে (এ বিষয়ে কবিতা রচনা করেন) এবং প্রসঙ্গক্রমে তিলমসানের শাসক সুলতান আবু হাম্মূ মূসার প্রশংসা করেন যাঁর কথা কিছুক্ষণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। (নাফহুত ত্বীব ৬/৫১০)

** ইবনে খালদুনের ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ঐতিহাসিক বর্ণনা পরবর্তীতে লেখার চেষ্ট করবো ইনশাআল্লাহ।



وكان السلطان أبوحموالممدوح بهذه القصيدة يحتفل لليلة مولد رسول الله صلى الله عليه وسلم غاية الاحتفال، كما كان ملوك المغرب والأندلس في ذلك العصر وما قبله

অন্ধকার ও প্রভাতের সময় মানুষ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে হেদায়াত লাভ করত। আর এই কাসীদায় যাঁর প্রশংসা করা হয়েছে, সেই সুলতান আবু হাম্মূ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদের রাত অত্যন্ত জাঁকজমক ও গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপন করতেন; যেমন সে যুগে এবং তার পূর্ববর্তী সময়ে মরক্কো ও আন্দালুসের রাজা-বাদশাহরা করতেন। (নাফহুত ত্বীব ৬/৫১৩)

 

ومن احتفاله له ما حكاه شيخ شيوخ شيوخنا الحافظ سيدي أبوعبد الله التنسي ثم التلمساني في كتابه راح الأرواح فيما قاله المولى أبوحمومن الشعر وقيل فيه من الأمداح وما يوافق ذلك على حسب الاقتراح ونصه: أنه كان يقيم ليلة الميلاد النبوي - على صاحبه الصلاة والسلام - بمشورة من تلمسان المحروسة مدعاة حفيلة يحشر فيها الناس خاصة وعامة، فما شئت من نمارق مصفوفة، وزرابي مبثوثة، وبسط موشاة، ووسائد بالذهب مغشاة، وشمع كالأسطوانات، وموائد كالهالات، ومباخر منصوبة كالقباب، يخالها المبصر تبراً مذاب، ويفاض على الجميع أنواع الأطعمة، كأنها أزهار الربيع المنمنمة، تشتهيها الأنفس وتستلذها النواظر، ويخالط حسن رياها الأرواح ويخامر، رتب الناس فيها على مراتبهم ترتيب احتفال، وقد علت الجميع أبهة الوقار والإجلال، وبعقب ذلك يحتفل المسمعون بأمداح المصطفى عليه الصلاة والسلام، ومكفرات (١) ترغب في الإقلاع عن الآثام، يخرجون فيها من فن إلى فن ومن أسلوب إلى أسلوب، ويأتون من ذلك بما تطرب له النفوس وترتاح إلى سماعه القلوب، وبالقرب من السلطان رضوان الله تعالى عليه خزانة المنجانة قد زخرفت كأنها حلة يمانية، لها أبواب موجفة (٢) على عدد ساعات الليل الزمانية،

আর হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের একটি দৃষ্টান্ত হলো আমাদের উস্তাদদের উস্তাদদের উস্তাদ, হাফিজ সাইয়্যিদ আবু আবদুল্লাহ আত-তানসী রহমতুল্লাহি আলাইহি আত-তিলমসানী তাঁর গ্রন্থ রাওহুল আরওয়াহতে যা বর্ণনা করেছেন। গ্রন্থটিতে মাওলা আবু হাম্মূনের কবিতা এবং তাঁর সম্পর্কে রচিত প্রশংসামূলক কবিতাগুলো, এবং প্রস্তাব অনুযায়ী এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য হলো:

তিলমসান নগরীতে তিনি হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের রাত উপলক্ষে পরামর্শক্রমে একটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেখানে বিশেষ ও সাধারণ সব শ্রেণির মানুষ সমবেত হতো।

তখন তুমি যত রকমের সারিবদ্ধ গদি, বিছানো কার্পেট, কারুকার্যখচিত চাদর-বিছানা, এবং সোনায় মোড়ানো বালিশ দেখতে চাইবে সবই সেখানে থাকত। থাকত স্তম্ভের মতো বড় বড় মোমবাতি, জ্যোতির্বলয়ের মতো সাজানো খাবারের টেবিল, এবং গম্বুজের মতো স্থাপিত ধূপদানী; দেখে মনে হতো যেন গলিত সোনা। সবার সামনে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হতো যেন বসন্তের নকশাখচিত ফুলের সমারোহ। তা মানুষের মনকে আকৃষ্ট করত এবং চোখকে আনন্দ দিত; তার সুগন্ধের সৌন্দর্য যেন মানুষের আত্মাকে পরিপূর্ণ করে দিত এবং মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলত।

মানুষকে তাদের মর্যাদা ও অবস্থান অনুযায়ী যথাযথভাবে বিন্যস্ত করা হতো, যথাযথ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখে। আর সকলের ওপরই গাম্ভীর্য ও সম্মানের জাঁকজমক বিরাজ করত।

এরপর মাওলিদ পাঠকারী ব্যক্তিরা নির্বাচিত হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রশংসা ও নাত শরীফ পরিবেশন করতেন এবং এমন মুকাফফিরাত পাঠ করতেন, যা মানুষকে পাপ থেকে বিরত হয়ে তওবা ও পাপ পরিত্যাগের প্রতি উৎসাহিত করত। তাঁরা এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে, এক রীতির পাঠ থেকে অন্য রীতির পাঠে যেতেন। তাঁরা এমনভাবে তা পরিবেশন করতেন, যা মানুষের মনকে আনন্দিত করত এবং শ্রোতাদের হৃদয়কে তা শুনে প্রশান্ত করে তুলত।

আর সুলতানের নিকটে আল-মানজানাহ-এর একটি কক্ষ ছিল, যা এমনভাবে সজ্জিত করা হয়েছিল যেন তা ইয়ামানি অলংকারে সজ্জিত কোনো পোশাক। তার দরজাগুলো রাতের সময়ের ঘণ্টাগুলোর সংখ্যা অনুযায়ী সাজানো থাকত। অতঃপর রাতের যত ঘণ্টা অতিক্রান্ত হতো, প্রতিটি ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী ততবার শব্দ করা হতো। আর তখন সেই কক্ষের একটি দরজা খোলা হতো। সেই দরজা দিয়ে একজন খাদেমা বেরিয়ে আসত, যাকে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতিতে সাজানো হতো। তার ডান হাতে থাকত একটি লিখিত পত্র, যাতে ওই নির্দিষ্ট ঘণ্টার নামকে কেন্দ্র করে রচিত একটি কবিতা লেখা থাকত। সে অত্যন্ত কোমলতা ও ভদ্রতার সঙ্গে পত্রটি সুলতানের সামনে রেখে দিত। আর তার বাম হাতটি সে মুখের কাছে রাখত যেন খিলাফতের প্রতি আনুগত্যের বায়আত সম্পাদনকারীর মতো।

এইভাবে তাদের অনুষ্ঠান চলতে থাকত ভোরের আলো ফুটে ওঠা পর্যন্ত এবং মুয়াজ্জিনের হাইয়া আলাল ফালাহধ্বনি শোনা পর্যন্ত।

 

وقال التنسي المذكور في كتابه المسمى بنظم الدر والعقيان في شرف بني زيان وذكر ملوكهم الأعيان ما نصه: وكان السلطان أبو حمو يقوم بحق ليلة مولد المصطفى صلى الله عليه وسلم، ويحتفل لها بما هوفوق سائر المواسم، يقيم مدعاة (١) يحشر لها لأشراف والسوقة، فما شئت من نمارق مصفوفة، وزرابي مبثوثة، وشمع كالأسطوانات، وأعيان الحضرة على مراتبهم تطوف عليهم ولدان قد لبسوا أقبية الخز الملون وبأيديهم مباخر ومرشات ينال كل منها بحظه، وخزانة ذات تماثيل لجين محكمة الصنعة، بأعلاها أيكة تحمل طائراً فرخاه تحت جناحيه، ويختله فيهما أرقم خارج من كوة بجذر الأيكة صاعدا (٢) ، وبصدرها أبواب مرتجة بعدد ساعات الليل الزمانية، يصاقب طرفيها بابان كبيران، وفوق جميعها دوين رأس الخزانة قمر أكمل يسير على خط الاستواء سير نظيره في الفلك، ويسامت أول كل ساعة بابها المرتج، فينتقض من البابين الكبيرين عقابان، بفي كل واحد منهما صنجة صفر يلقيها إلى طست من الصفر بوسطه ثقب يفضي بها إلى داخل الخزانة فيرن، وينهش الأرقم أحد الفرخين، فيصفر له أبوه، فهناك يفتح باب الساعة الذاهبة، وتبرز منه جارية محتزمة كاظرف ما أنت راء، بيمناها إضبارة فيها اسم ساعتها منظوماً، ويسراها موضوعة على فيها كالميابعة بالخلافة، والمسمع قائم ينشد أمداح سيد المرسلين وخاتم النبيين ومولانا محمد صلى الله عليه وسلم، 

উল্লিখিত তানসী তাঁর নাযমুদ দুররি ওয়াল-ইকিয়ান ফি শরাফি বানী যাইয়ান ওয়া যিকরি মুলূকিহিম আল-আইয়ান নামক গ্রন্থে নিম্নোক্ত কথা বলেছেন:

সুলতান আবু হাম্মূ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করতেন এবং অন্যান্য সকল মৌসুম ও উৎসবের তুলনায় এই রাতের জন্য আরও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করতেন। তিনি একটি বৃহৎ দাওয়াতের আয়োজন করতেন, যাতে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাইকে সমবেত করা হতো।

সেখানে থাকত সারিবদ্ধভাবে সাজানো গদি, বিছানো কার্পেট এবং স্তম্ভের মতো বড় বড় মোমবাতি। রাজদরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী নিজ নিজ স্থানে থাকতেন। তাদের চারপাশে এমন সব বালক ঘুরে বেড়াত, যারা রঙিন পোশাক পরিহিত ছিল এবং তাদের হাতে থাকত ধূপদানী ও সুগন্ধি ছিটানোর পাত্র। ফলে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ নিজ অংশ অনুযায়ী সুগন্ধি ও সৌরভ লাভ করত।

আর সেখানে ছিল একটি কারুকার্যখচিত কক্ষ, যার মধ্যে রূপার তৈরি বিভিন্ন আকৃতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্মিত ছিল। তার উপরে ছিল একটি বৃক্ষের মতো কাঠামো, যার ওপর একটি পাখি বসানো ছিল এবং তার দুই ছানা তার দুই ডানার নিচে ছিল। একটি সর্পসদৃশ বস্তু গাছটির গোড়ার একটি ছিদ্র থেকে বের হয়ে উপরের দিকে উঠত এবং পাখির ছানাদুটিকে আক্রমণ করত।

সেই ভাণ্ডারের সম্মুখভাগে রাতের সময়ের ঘণ্টার সংখ্যার সমান সংখ্যক বন্ধ দরজা ছিল। এর দুই পাশে ছিল দুটি বড় দরজা। সবগুলোর উপরে, ভাণ্ডারের মাথার কিছু ওপরে, একটি পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোলক ছিল, যা বিষুবরেখার ওপর আকাশে তার অনুরূপ বস্তুর চলার মতো চলত।

এদিকে একজন মাওলিদ-পাঠক দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং তিনি নবী-রাসুলগণের সাইয়্যিদ, সর্বশেষ নবী এবং আমাদের মাওলা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রশংসামূলক কবিতা পাঠ করতেন।

 

ثم يؤتى آخر الليل بموائد كالهالات دوراً، والرياض نوراً، وقد اشتملت من أنواع محاسن المطاعم (١) على ألوان تشتهيها الأنفس وتستحسنها الأعين، وتلذ بسماع أسمائها الآذان، وبشرة مبصرها للقرب منها والتناول وإن كان ليس بغرثان، والسلطان لم يفارق مجلسه الذي أبتدأ جلوسه فيه، وكل ذلك بمرأى منه ومسمع حتى يصلي هنالك صلاة الصبح. على هذا الأسلوب تمضي ليلة المصطفى صلى الله عليه وسلم في جميع أيام دولته، أعلى الله تعالى مقامه في عليين، وشكر له في ذلك صنيعه الجميل آمين.

এরপর রাতের শেষভাগে গোলাকৃতিতে চাঁদের মতো সাজানো খাবারের টেবিলসমূহ আনা হতো এবং সেগুলো যেন আলোয় উদ্ভাসিত বাগানের মতো দেখাত। সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু খাবার থাকত এমন সব রকমের খাবার, যা মানুষের মন কামনা করত, চোখে সুন্দর লাগত এবং যার নাম শুনতেও কান আনন্দ পেত। এমনকি যে ব্যক্তি ক্ষুধার্ত নয়, সেও সেগুলো দেখে কাছে গিয়ে খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করত।

আর সুলতান যে আসনে বসে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে একটুও বিচ্ছিন্ন হতেন না। এসব কিছু তাঁর চোখের সামনে এবং তাঁর শ্রবণের মধ্যে সংঘটিত হতো এমনকি তিনি সেখানেই ফজরের নামাজ আদায় করতেন।

এই পদ্ধতিতেই সুলতানের সমগ্র শাসনকাল জুড়ে মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাওলিদের রাত অতিবাহিত হতো। আল্লাহ তাআলা আখিরাতে উনার মর্যাদা উচ্চ করুন এবং এর জন্য তাঁর এই সুন্দর কাজের প্রতিদান হিসেবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আমিন। (নাফহুত ত্বীব ৬/৫১৫)

 

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! ভেবে দেখেন ৮ম হিজরী শতকে আলজেরিয়াতে সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় কতটা জাঁকজমকের সাথে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালিত হতো। যুগশ্রেষ্ঠ আলেম উলামারা সেই মাহফিলে উপস্থিত থাকতেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সময়ে পৃথিবীব্যাপী আবারো সেই জাঁকজমকের সাথে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করতে হবে।

মিশরে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ইতিহাস

মিশরে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ইতিহাস-

শায়খ জামালুদ্দীন আবুল মাহাসিন ইউসুফী ইবন তাগরী বারদী রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ৮৭৪ হিজরী) মিশরের ইতিহাস বিষয়ক সুবিশাল গ্রন্থ ‘আন নুজূমুয যাহিরাহ ফী মুলূকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ’র ১২তম খন্ড ৭২-৭৪ পৃষ্ঠাতে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের বিস্তারিত বর্ণণা প্রদান করেন,



وفى ليلة الجمعة ثانى شهر ربيع الأول عمل السلطان ‌المولد ‌النبوىّ على العادة فى كلّ سنة. قلت: نذكر صفة ما كان يعمل بالمولد قديما ليقتدى به من أراد تجديده فلمّا كان يوم الخميس المذكور، جلس السلطان بمخيّمه بالحوش السلطانى، وحضر القضاة والأمراء ومشايخ العلم والفقراء، فجلس الشيخ سراج الدين عمر البلقينى عن يمين السلطان، وتحته الشيخ برهان الدين إبراهيم بن زقّاعة، وجلس على يسار السلطان الشيخ المعتقد أبو عبد الله المغربى، ثم جلس القضاة يمينا وشمالا على مراتبهم، ثم حضر الأمراء فجلسوا على بعد من السلطان، والعساكر ميمنة وميسرة فقرأت الفقهاء، فلمّا فرغ القرّاء وكانوا عدّة جوق كثيرة، قام الوعاظ واحدا بعد واحد، وهو يدفع لكل منهم صرّة فيها أربعمائة درهم فضة، ومن كلّ أمير شقّة حرير خاصّ وعدّتهم عشرون واحدا.
وأنعم أيضا على القرّاء لكل جوقة بخمسمائة درهم فضة وكانوا أكثر من الوعّاظ، ثم مدّ سماط جليل يكون مقداره قدر عشرة أسمطة من الأسمطة الهائلة، فيه من الأطعمة الفاخرة ما يستحى من ذكره كثرة، بحيث إن بعض الفقراء أخذ صحنا فيه من خاصّ الأطعمة الفاخرة فوزن الصحن المذكور فزاد على ربع قنطار.
ولمّا انتهى السّماط «٢» مدّت أسمطة الحلوى من صدر المخيّم إلى آخره.
وعند فراغ ذلك مضى القضاة والأعيان وبقى السلطان فى خواصّه وعنده فقراء الزوايا والصوفية، فعند ذلك أقيم السّماع من بعد ثلث الليل إلى قريب الفجر وهو جالس عندهم ويده تملأ من الذهب، وتفرّغ لمن له رزق فيه والخازندار يأتيه بكيس بعد كيس، حتى قيل: إنّه فرّق فى الفقراء ومشايخ الزوايا والصوفية فى تلك الليلة أكثر من أربعة آلاف دينار.
هذا، والسّماط من الحلوى والفاكهة يتداول مدّة بين يديه، فتأكله المماليك والفقراء وتكرّر ذلك أكثر من عشرين مرّة.
ثم أصبح السلطان ففرّق فى مشايخ الزوايا القمح من الأهراء «١» لكل واحد بحسب حاله وقدر فقرائه، كلّ ذلك خارج عمّا كان لهم من الرواتب عليه فى كلّ سنة حسب ما يأتى ذكر ذلك فى آخر ترجمة الملك الظاهر بعد وفاته.
৮০০ হিজরি সনের রবীউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, বৃহস্পতিবারের রাতে, সুলতান আয যাহির বারকূক (ওফাত: ৮০১ হিজরী) প্রতি বছরের নিয়ম অনুযায়ী মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আয়োজন করেন। আমি এখানে পূর্বকালে মাওলিদের সময় কীভাবে আয়োজন করা হতো, তার পদ্ধতি উল্লেখ করছি যাতে যারা এ ধরনের আয়োজন করতে চায়, তারা এর অনুসরণ করতে পারে।
উল্লিখিত বৃহস্পতিবারের দিন সুলতান রাজকীয় প্রাঙ্গণের ‘হাওশ’-এ তাঁর শিবিরে বসেন। সেখানে কাজীগণ, আমীরগণ, আলেম-মাশায়েখ এবং ফকীরগণ উপস্থিত হন।
সুলতানের ডান পাশে বসেন শায়খ সিরাজুদ্দীন উমর আল-বুলকীনী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর নিচে বসেন শায়খ বুরহানুদ্দীন ইবরাহীম ইবন যাক্কাআহ।
সুলতানের বাম পাশে বসেন শায়খ আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবী, যিনি ‘আল-মু‘তাকাদ’ নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর কাজীগণ তাঁদের মর্যাদা ও পদ অনুযায়ী ডান ও বাম পাশে বসেন। তারপর আমীরগণ উপস্থিত হন এবং সুলতানের থেকে কিছুটা দূরে বসেন। সৈন্যবাহিনী ডান ও বাম পাশে অবস্থান নেয়।
এরপর ফকীহগণ কুরআন তিলাওয়াত করেন। যখন ক্বারীগণ তিলাওয়াত শেষ করলেন তাঁরা ছিলেন অনেকগুলো দল। তখন ওয়ায়েজগণ একের পর এক দাঁড়িয়ে ওয়াজ করতে থাকেন।
সুলতান প্রত্যেক ওয়ায়েজকে ৪০০ রৌপ্যমুদ্রা সম্বলিত একটি থলি প্রদান করতেন। আর প্রত্যেক আমীরের পক্ষ থেকে একটি করে বিশেষ কাপড়ের বস্ত্র দেওয়া হতো, এমন আমীরের সংখ্যা ছিল ২০ জন। তিনি ক্বারীদেরও পুরস্কৃত করেন, প্রত্যেক দলকে ৫০০ রৌপ্যমুদ্রা দেওয়া হয়। ক্বারীদের সংখ্যা ওয়ায়েজদের চেয়েও বেশি ছিল।
এরপর একটি বিরাট খাবারের দস্তরখান বিছানো হয়। এর পরিমাণ ছিল প্রায় দশটি বিশাল দস্তরখানের সমান। তাতে এত বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের ও মূল্যবান খাবার ছিল যে, তার আধিক্য বর্ণনা করতেও লজ্জা হয়। এমনকি একজন ফকীর সেই উৎকৃষ্ট খাবারের একটি থালা নিয়ে নেন। থালাটি ওজন করা হলে দেখা যায়, তার ওজন এক-চতুর্থাংশ ক্বিনতার-এরও বেশি।
যখন সেই খাবারের দস্তরখান শেষ হলো, তখন মিষ্টির দস্তরখানগুলো শিবিরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিছিয়ে দেওয়া হলো।
এরপর যখন এসব শেষ হলো, তখন কাজীগণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা চলে গেলেন। সুলতান তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ লোকজনের মধ্যে থেকে গেলেন। তাঁর কাছে ফকীর ও সুফিরাও ছিলেন।
তখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে প্রায় ফজর পর্যন্ত ‘সামা‘’ অনুষ্ঠিত হলো। সুলতান তাঁদের সঙ্গে বসে রইলেন। উনার হাতে সোনার মুদ্রা ভরা থাকত, যাদের জন্য এর মধ্যে নির্ধারিত প্রাপ্য ছিল, তাদের জন্য তিনি তা বের করে দিতেন। আর খাজানাদার একের পর এক থলে এনে দিচ্ছিল।
এমনকি বলা হয়েছে, সেই রাতে তিনি ফকীর, জাওয়িয়ার শায়খ ও সুফিদের মধ্যে চার হাজারেরও বেশি দিনার বিতরণ করেছিলেন।
এদিকে মিষ্টি ও ফলের দস্তরখান কিছু সময় পরপর উনার সামনে পরিবেশন করা হচ্ছিল। মামলুক ও ফকীররা তা খেত। এভাবে বিশবারেরও বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।
এরপর সকাল হলে সুলতান শায়খদের মধ্যে রাজকীয় খাদ্যভাণ্ডার থেকে গম বিতরণ করলেন। প্রত্যেককে তার অবস্থা এবং তার অধীনস্থ ফকীরদের সংখ্যা অনুযায়ী গম দেওয়া হলো।
এসব কিছুই ছিল তাঁদের জন্য সুলতানের পক্ষ থেকে প্রতি বছর যে নিয়মিত ভাতা নির্ধারিত ছিল, তার অতিরিক্ত। উনার ইন্তেকালের পর তাঁর জীবনীতে পরবর্তী অংশে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে।”
(আন নুজূমুয যাহিরাহ ফী মুলূকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ ১২তম খন্ড ৭২-৭৪ পৃষ্ঠা)
এই আয়োজনের কথা হাফিজুল হাদীছ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজে উনার কিতাবে বর্ণনা করেন, যা ইতিপূর্বে আমার পোষ্টে আলোচনা করেছি। আজকের এই বর্ণনায় কতাটা ব্যাপকভাবে পালিত হতো সে দলীল দেয়া হলো।
উপরোক্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো,
نذكر صفة ما كان يعمل بالمولد قديما ليقتدى به من أراد تجديده
‘আমি এখানে পূর্বকালে মাওলিদের সময় কীভাবে আয়োজন করা হতো, তার পদ্ধতি উল্লেখ করছি যাতে যারা এ ধরনের আয়োজন করতে চায়, তারা এর অনুসরণ করতে পারে।’
কতটা গুরুত্ব ও শান শওকতের সাথে পালিত হতো এক সময় চিন্তা ও ফিকির করে দেখেন। পৃথিবী বিখ্যাত আলেম উলামা, ফক্বীহগন সেখানে উপস্থিত থাকতেন। মানুষ যাতে পরবর্তীতে তেমন শান শওকত বাজায় রেখে পালন করতে পারে সে জন্য ইতিহাসের পাতায় তিনি লিখে গেলেন।

পাঁচশ হিজরী শতকে ওলীআল্লাহ হযরত উমর মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন

ইস্পাহানের বিখ্যাত সাহিত্যিক, কবি, ইতিহাসবিদ এবং অনুবাদক ছিলেন আল ফাতহ ইবনে আলী আল বুন্দারি ইসফাহানি রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ৬৪৩ হিজরী)। তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কাজগুলোর একটি হলো ফেরদৌসীর বিখ্যাত ফারসি মহাকাব্য শাহনামা এর আরবি অনুবাদ। তিনি ইমাদুদ্দীন আল-ইসফাহানীর বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ `বারক আল-শামী' এর সংক্ষিপ্ত সংস্করণ `মুখতাসারু সানাল বারকিশ শামী' রচনা করেন। ৫ম–৬ষ্ঠ হিজরি শতক সিরিয়া, জাজিরা ও আশপাশের অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও শাসন-ইতিহাস নিয়ে রচিত এই বই।

এই বইতে তিনি ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের প্রাচীণ একটি ইতিহাস বর্ণনা করেন। বিখ্যাত বুযূর্গ ওলী হযরত আবু হাফস উমর ইবন মুহাম্মদ ইবন খিদর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির (ওফাত: ৫৭০ হিজরী) মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন একটি ঐতিহাসিক দলীল। হযরত উমর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহি কে ছিলেন?
ইবন কাসীর রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন,
الشيخ الصالح العابد عمر الملا
“শায়খ, নেককার ও ইবাদতগুজার উমর আল-মুল্লা। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৬/৪৪৬)
তিনি আরো বলেন,
وكان من الصالحين الزاهدين
“তিনি নেককার ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৬/৪৮৯)


হযরত উমর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন বিষয়ে হযরত ফাতহ ইবনে আলী আল বুন্দারি ইসফাহানি রহমতুল্লাহি আলাইহি তার ‘মুখতাসারু সানাল বারকিশ শামী’র ৫২ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন,
‌كان ‌بالموصل ‌رجل ‌من ‌شيوخ ‌الصالحين وأئمة العارفين يعرف بعمر العلاء وكان العلماء بل الملوك والأمراء يزورونه في زاويته وله كل سنة دعوة في أيام مولد النبي صلى الله عليه وسلم يحضره فيها صاحب الموصل ويحضر الشعراء وينشدون في ذلك المحفل في مدح النبي صلى الله عليه وسلم وكان يخرج لهم جوايزهم. وكان نور الدين من أخلص محبيه وأحب مخالصيه وكان يستشيره ويكاتبه،
মাওসিলে একজন নেককার বুযুর্গ ও আরিফদের ইমাম ছিলেন। উনার নাম ছিল উমর আল-মাল্লা। আলেমগণ এমনকি বাদশাহ ও আমীররাও উনার খানকাহে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। প্রতি বছর মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিনগুলোতে উনার পক্ষ থেকে একটি দাওয়াতের আয়োজন করা হতো। এতে মাওসিলের শাসকও উপস্থিত হতেন। কবিরাও আসতেন এবং সেই সমাবেশে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করতেন। তিনি তাঁদের পুরস্কারও দিতেন। সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী উনার অত্যন্ত একনিষ্ঠ ভক্ত ও ঘনিষ্ঠ অনুরাগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি উনার সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাঁকে চিঠিপত্র লিখতেন। (মুখতাসারু সানাল বারকিশ শামী ৫২ পৃষ্ঠা)
অনেক বলে থাকেন, সর্বপ্রথম বাদশা মালিক মুজাফফর রহমতুল্লাহি প্রথম জাতীয়ভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেন। এ তথ্য ভুল। বাদশা মালিক মুজাফফর রহমতুল্লাহির ওফাত ৬৩০ হিজরীতে। আর উমর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির ওফাত হচ্ছে ৫৭০ হিজরীতে। উমর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির ৬০ বছর আগে ইন্তেকাল করেন। উমর আল-মুল্লা রহমতুল্লাহি আলাইহির সমসাময়ীক নুরুদ্দীন জঙ্গী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও জাতীয়ভাবে পালন করেন, যা বদরুদ্দীণ আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইকদুল জুমান ফি তারীখী আহলিল জামান কিতাবে বর্ণনা করেন।
সবচাইতে বড় কথা হলো ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন ছিলো নেককার, দুনিয়া বিরাগী, তাকওয়া সম্পন্ন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট। ইতিহাসের পাতায় যা স্পষ্ট লেখা আছে।