সূত্র উল্লেখের গুরুত্ব: ইলমী আমানতদারির এক অনন্য শিক্ষা
হযরত শায়খ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন’-এ হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মধ্যকার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার বর্ণনা করেছেন।
একবার হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি অভিযোগ করেন যে, হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ’ গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিভিন্ন রচনা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন; কিন্তু সে বিষয়ে কোথাও কোনো সূত্র-উল্লেখ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি। হযরত সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দৃষ্টিতে এটি ছিল জ্ঞানচর্চার নীতিমালার পরিপন্থী এবং খিয়ানতের পর্যায়ের একটি গুরুতর অভিযোগ ।
পরবর্তীতে বিষয়টি ফয়সালার উদ্দেশ্যে তৎকালীন শায়খুল ইসলাম হযরত যায়নুদ্দীন যাকারিয়া আনসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট উপস্থাপিত হয়। সেখানে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করেন।
উল্লেখযোগ্য অভিযোগগুলোর একটি ছিল এই যে, ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ’ গ্রন্থে ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বরাতে কয়েকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেগুলো ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কোন মূল গ্রন্থে বিদ্যমান তা যেন হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যেন প্রদর্শন করেন। কিন্ত হযরত কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তা করতে সক্ষম হননি।
এ পর্যায়ে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, উক্ত বর্ণনাগুলো প্রকৃতপক্ষে হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করেছেন; আর তিনি নিজে সেগুলো ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন। অতএব, হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উচিত ছিল এভাবে উল্লেখ করা যে, “হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বরাতে এ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।” এতে যেমন উনার গবেষণাগত অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা হতো, তেমনি নকলের অভিযোগ থেকেও তিনি মুক্ত থাকতেন।
বর্ণনা অনুযায়ী, এ ঘটনার পর হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত মর্মাহত অবস্থায় মজলিস ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বহু চেষ্টা করেন হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মনঃকষ্ট দূর করে উনার সন্তুষ্টি অর্জনের।
অবশেষে একদিন তিনি মিসর নগরী থেকে পদব্রজে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বাসভবনে উপস্থিত হন। দরজায় করাঘাত করলে ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “কে?”
তিনি উত্তর দেন:
“আমি আহমদ। আমি খালি পায়ে ও খালি মাথায় আপনার দরজায় উপস্থিত হয়েছি, যেন আপনার অন্তরের কষ্ট দূর হয় এবং আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন।”
তখন হযরত শায়খ জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি ভেতর থেকেই উত্তর দেন:
“আমি আমার অন্তর থেকে সমস্ত অভিযোগ দূর করে ফেলেছি।”
কিন্তু এরপরও তিনি দরজা আর খোলেননি এবং হযরত শাহাবুদ্দীন কাস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও করেননি।
এখানে অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে। একজন গবেষক অনেক অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটা লেখা লিখেন। অনলাইনের যুগে এক ক্লিকে লেখাটা হয়তো আপনার ক্লিপবোর্ডে চলে আসে কিন্তু ওই লিখাটার পেছনে একটা গল্প থাকে। মূল লেখকের অসংখ্য নির্ঘুম রাত জাগা প্রচেষ্টা, বহু কষ্টে মেরুদণ্ড ব্যাথা করে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে দলীল অনুসন্ধান করা, একনাগাড়ে বইয়ের পাতায় তাকিয়ে থেকে দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে ফেলা, বছরকে বছর ব্যয় করে ফলাফল নিয়ে আসা। কার্টেসি ছাড়া একটা লেখা প্রচার করলে এ গল্প আপনি জানবেন না।
যেখান থেকেই তিনি উপকৃত হোন না কেন, যথাযথ সূত্র-উল্লেখের মাধ্যমে সেই ব্যক্তির অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি মানুষের অবদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে প্রকৃত অর্থে ইলমের হকও আদায় করতে পারে না। গবেষণার প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল নতুন তথ্য উপস্থাপনের মধ্যে নয়, বরং অন্য গবেষকদের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের মধ্যেও নিহিত।






0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন