মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নবিজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার বিষয়ে “মুসলিম শরীফের” সেই বর্ণনার স্মরূপ সন্ধান।

নবিজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার বিষয়ে “মুসলিম শরীফের” সেই বর্ণনার স্মরূপ সন্ধান। 



হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য উনার পিতা-মাতা বিষয়ে বাতিল ফিরকার লোকেরা বিভিন্ন এলোমেলো কথা বলে থাকে। উনাদের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নাউযুবিল্লাহ!

তাদের দাবির স্মরূপ উন্মোচনের জন্য এ কলাম লিপিবদ্ধ করা হলো।
তারা মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে সিহাহ ছিত্তার অন্যতম কিতাব “মুসলিম শরীফে” বর্ণিত একটা বর্ণনার আশ্রয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বর্ণনাটি সনদসহ উল্লেখ করা হলো,
حَدَّثَـنَا أَبُـوْ بَكْرِ بْنُ أَبِيْ شَيْـبَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا عَفَّانُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَيْنَ أَبِيْ؟ قَالَ: فِي النَّارِ، فَـلَمَّا قَـفَّى دَعَاهُ، فَـقَالَ: ‌إِنَّ ‌أَبِيْ ‌وَأَبَاكَ ‌فِي ‌النَّارِ
অর্থ: এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন, জাহান্নামে। তখন এটা তার নিকট কষ্টদায়ক হল। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাকে ডেকে বললেন, আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামে। নাউযুবিল্লাহ! (মুসলিম শরীফ -কিতাবুল ঈমান: হাদীছ ৩৪৭)

এই বর্ণনা থেকে তারা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতার বিষয়ে জঘণ্যতম অপবাদ উপস্থান করে। একটা বিষয় গভীরভাবে খেয়াল রাখা উচিত ও সর্তক থাকা উচিত “যদি কোন কিতাবে তা যে কিতাবই হোক না কেন সেখানে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম, হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের শান মুবারকের খিলাফ কিছু থাকলে সে বর্ণনা চোখ বুজে গ্রহন করা যাবে না।” সেই বর্ণনার আদ্যপান্ত অনুসন্ধান করে দেখতে হবে কোথাও কোন ঘাপলা আছে কিনা। এর মানদণ্ডে উপরোক্ত বর্ণনার স্বরূপ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে বর্ণনা প্রকৃত চিত্র।

উক্ত আপত্তিকর বর্ণনার সনদ হচ্ছে-
حَدَّثَـنَا أَبُـوْ بَكْرِ بْنُ أَبِيْ شَيْـبَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا عَفَّانُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَدَّثَـنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ
অর্থ: হাদীছ শরীফ বর্ননা করেন- হযরত আবু বকর ইবনে আবী শায়বা রহমতুল্লাহি আলাইহি, তিনি হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে।

মুসলিম শরীফের এই সনদ সহ বর্ণনা উল্লেখ করে ইমাম হযরত বাযযার রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وَهٰذَا الْحَدِيْثُ لَا نَـعْلَمُ رَوَاهُ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ إلَّا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ
এই হাদীছ শরীফখানা হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি ব্যাতীত অন্য কারো থেকে বর্ণিত হয়নি। (মুসনাদে বাযযার ৬৮০৮; প্রকাশনা- মাকতাবাতুল মাদীনাতুল মুনাওয়ারা)

উক্ত বর্ণনা বিষয়ে হাফিজুল হাদীছ, হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
أَنَّ هٰذِهِ اللَّفْظَةَ وَهِيَ قَـوْلُهٗ: إِنَّ أَبِيْ وَأَبَاكَ فِي النَّارِ لَمْ يَـتَّفِقْ عَلٰى ذِكْرِهَا الرُّوَاةُ، وَإِنَّمَا ذَكَرَهَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، وَهِيَ الطَّرِيْقُ الَّتِيْ رَوَاهُ مُسْلِمٌ مِنْـهَا
উল্লেখিত ইবারতটি ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ এর ব্যাপারে বর্ণনাকারীগণ ঐকমত্য পোষণ করেননি। এটা বর্ণনা করেছেন হযরত হাম্মাদ বিন সালমা তিনি। তিনি ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এই সূত্রেই হাদিস শরীফখানা বর্ণনা করেছেন। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই ব্যাপারে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সনদে ও ভিন্ন মতনে সহীহ হাদীছ শরীফ উল্লেখ আছে। আপত্তিকর বর্ণনাটি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয় বর্ণনাটি হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সনদে ব্যতিক্রমভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সেখানে ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ বাক্যটি উল্লেখ করেননি।
ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই সনদখানা উল্লেখ করেছেন উনার কিতাবে,
‌رِوَايَةُ ‌مَعْمَرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌عَنْ ‌ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌عَنْ ‌أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ
হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩, সুবলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ১/২৪৮, ফতহুর রব্বানী ৮/১৭০)

হযরত ইমাম যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে উল্লেখ করেন,
وَقَدْ أَعَلَّ السُّهَيْلِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، هٰذَا الْحَدِيْثَ بِأَنَّ مَعْمَرَ بْنَ رَاشِدٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فِيْ رِوَايَــتِهٖ عَنْ ثَابِتٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ خَالَفَ حَمَّادًا، فَـلَمْ يَذْكُرْ أَنَّ أَبِيْ وَأَبَاكَ فِي النَّارِ، بَلْ قَالَ: إِذَا مَرَرْتَ بِقَبْرٍ كَافِرٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ
ইমাম হযরত সুহাইলী রহমতুল্লাহি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এই বর্ণনাটি হযরত মা’মার ইবনে রশিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে রেওয়ায়েত করেন, তিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন। সেখানে তিনি ‘আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামী’ এ ধরণের কোন কথা উল্লেখ করেননি বরং তিনি উল্লেখ করেছেন, “ যখন তুমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে।” (শরহু যারকানী আলাল মাওয়াহেব ১/৩৩৭; প্রকাশনা- দারু কুতুব আল ইলমিয়া, বাইরূত- লেবানন)

আপত্তিকর বর্ণনাটির বিষয়ে মুসনাদে আহমদে উক্ত হাদীছ শরীফের টীকায় উল্লেখ আছে-
رِجَالُهٗ ثِقَاتٌ رِجَالُ الشَّيْخَيْنِ غَيْـرَ حَمَّادٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، وَهُوَ اِبْنُ سَلَمَةَ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَمَنْ رِجَالُ مُسْلِمٍ، وَقَدْ تَـفَرَّدَ بِرِوَايَةِ هٰذَا الْحَدِيْثِ بِـهٰذَا اللَّفْظِ، وَخَالَفَهٗ مَعْمَرٌ عَنْ ثَابِتٍ
বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত, বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের রাবী, তবে হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি ব্যাতীত। তিনি হচ্ছেন ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি মুসলিম শরীফের রাবী। তিনি এককভাবে এই শব্দে এই বর্ণনাটি (আপত্তিকর বর্ণনাটি) উল্লেখ করেছেন। অথচ হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে এর ভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন (অর্থাৎ সেখানে আপত্তিকর কথাটি নেই)। (মুসনাদে আহমদ ১২১৯২ নং হাদীছ শরীফ উনার টীকায় সমসাময়িক তাহকীককারী শুয়াইব আরনাউতের তাহকীক)

সূতরাং হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির এই ইবারতটি কখনো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামকে অন্তর্ভূক্ত করে না। কারণ উক্ত সনদটির চাইতে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহির সনদ অধিক শক্তিশালী। কারণ হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির চেয়ে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি অধিক নির্ভরযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
فَإِنَّ حَمَّادًا رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، تُكُلِّمَ فِيْ حِفْظِهٖ وَوَقَعَ فِيْ أَحَادِيْثِهِ مَنَاكِيْـرُ ذَكَرُوْا أَنَّ رَبِيْـبَةَ دَسَّهَا فِيْ كُتُبِهِ، وَكَانَ حَمَّادٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، لَا يَحْفَظُ فَحَدَّثَ بِهَا فَـوَهِمَ فِيْهَا، وَمَنْ ثُـمَّ لَـمْ يُخَرِّجْ لَهُ الْبُخَارِيُّ شَيْـئًا، وَلَا خَرَّجَ لَهُ مُسْلِمٌ فِي الْأُصُوْلِ إِلَّا مِنْ رِوَايَتِهِ عَنْ ثَابِتٍ
হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে এবং উনার বর্ণনার মধ্যে অনেক মুনকার বর্ণনা রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, রবিবাহ তার কিতাবে ভুলক্রমে বিষয়টি ছেড়ে দিলেন। কিন্তু হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বিষয়টি সংরক্ষণ রাখতে পারেননি এবং এভাবেই বর্ণনা করলেন। সুতরাং এ ব্যাপারটি লক্ষ্যণীয়। তদুপরি হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে কোন হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেননি। ইমাম হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিও প্রকৃতপক্ষে হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির হাদীছ শরীফ ছাড়া অন্য কোন বর্ণনা উল্লেখ করেননি। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩; প্রকাশনা- দারুল ফিকর, বাইরূত, লেবানন)

হযরত ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাদখাল কিতাবে বলেছেন,
مَا خَرَجَ مُسْلِمٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، لِحَمَّادٍ فِى الْاُصُوْلِ اِلَّا مِنْ حَدِيْثِهِ عَنْ ثَابِتٍ
অর্থ: ইমাম হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির হাদীছ শরীফ ব্যতীত অন্য কোন হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেননি। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ ১/২৪৮)
লা’মাযহাবীদের মুরুব্বী নাসিরুদ্দীন আলবানীও তার ছহীহ সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় ৬/২৮ পৃষ্ঠায়ও এই কথা উল্লেখ করেছে।

যে রাবীকে নিয়ে আপত্তি সেই হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির বিষয়ে হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার আসমাউর রেজালের কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
قَالَ الْبَيْهَقِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ‌هُوَ ‌أَحَدُ ‌أَئِمَّةِ ‌الْمُسْلِمِيْنَ ‌اِلَّا ‌أَنَّهٗ ‌لَمَّا ‌كَبِرَ ‌سَاءَ ‌حِفْظُهٗ ‌فَلِذَا ترَكَهُ الْبُخَارِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، وَأَمَّا مُسْلِمٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَاَجْتَـهَدَ
অর্থ: হযরত ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তিনি (হযরত হাম্মাদ ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি) মুসলিম ইমামদের একজন হলেও বৃদ্ধ বয়সে তার স্মরণ শক্তিতে সমস্যা দেখা দেয়। এ জন্য হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে পরিত্যাগ করেছেন, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব ৩/১৪)

ইমাম হযরত যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেন,
وقَالَ حَضْرَتِ الذَّهْبِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، حَضْرَتْ حَمَّادُ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ثِقَةٌ لَهٗ أَوْهَامٌ وَمَنَاكِيْـرُ كَثِيْـرَةٌ
ইমাম হযরত যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমাম হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিশ্বস্ত কিন্তু স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ার পর তার দ্বারা অনেক মুনকার বর্ণনার সৃষ্টি হয়। (শরহু যারকানী আলাল মাওয়াহেব ১/৩৩৭)

এ থেকে প্রমাণিত হলো হযরত হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহির শেষ বয়সে স্মরনশক্তিতে ত্রুটি দেখা দেয় এবং তার বর্ণনায় পরিবর্তন পরিবর্ধন সৃষ্টি হয়। আর হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত আপত্তিকর বর্ণনাটি বিচ্ছিন্ন ও একক একটি বর্ণনা যা অন্য কেউ বর্ণনা করেনি। অপরদিকে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে আরেকটি বিশুদ্ধ সনদ যা হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত হয়েছে যেখানে আপত্তিকর কথাটি নেই। আর হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَأَمَّا مَعْمَرٌ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، فَـلَمْ يُـتَكَلَّمْ فِيْ حِفْظِهٖ وَلَا اُسْتُـنْكِرَ شَيْءٌ مِنْ حَدِيْثِهٖ، وَاتَّـفَقَ عَلَى التَّخْرِيْجِ لَهُ الشَّيْخَانِ فَكَانَ لَفْظُهُ أَثْـبَتَ
কিন্তু হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্মৃতিশক্তি সম্বন্ধে কেউ কোন আপত্তি করেননি। এবং উনার কোন বর্ণনা মুনকার পর্যায়ের নেই। তাছাড়া শাইখাইন হযরত বুখারী ও মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিম তার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ গ্রহনের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। অতএব উনার বর্ণনা অধিক নির্ভরযোগ্য। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)


হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার শানের খেলাফ মুসলিম শরীফের আলোচ্য বর্ণনাখানার বিপরীতে আরো কমপক্ষে ৫ জন ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম থেকে ভিন্ন সনদে বর্ণনা আছে, যেখানে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতার বিষয়ে আপত্তিকর কথা তো দূরের কথা বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা উল্লেখ আছে।

বর্ণনা নং ১ঃ
পূর্ণ বর্ণনাখানা উল্লেখ করা হলো-
عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ رَضِىَ اللهُ تَـعَالٰى عَنْهُ، عَنْ أَبِيْهِ، أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيْنَ أَبِيْ؟ قَالَ فِي النَّارِ. قَالَ: فَأَيْنَ أَبُوكَ؟ قَالَ حَيْثُ مَا مَرَرْتَ ‌بِقَبْرِ ‌كَافِرٍ ‌فَـبَشِّرْهُ ‌بِالنَّارِ
অর্থ: হযরত আমীর ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার পিতা হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলল- ‘আমার পিতা কোথায়? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, জাহান্নামে। অতঃপর লোকটি বলল আপনার পিতাজান তিনি কোথায়? হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন তুমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। (মুসনাদে বাযযার ১০৮৯, দালায়েলুন নবুয়াত লিল বায়হাকী১/১৯২)

এই সনদের ব্যাপারে ইমাম হযরত নুরুদ্দীন ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وَرِجَالُهٗ رِجَالُ الصَّحِيْحِ
উক্ত বর্ণনার সকল রাবী বুখারী মুসলিম শরীফের রাবী। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ আল মানবাউল ফাওয়ায়েদ ২/২০৮: বর্ণনা ৪৬৮)

ইমাম হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উপরোক্ত হাদীছ শরীফের সনদের বিষয়ে বলেন,
وَهٰذَا إِسْنَادٌ عَلٰى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ
এই সনদখানা ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। (আল হাওয়ী লিল ফাতাওয়া ২/২৭৩)

এ হাদীছ শরীফ থেকে আমরা দেখতে পেলাম এখানে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত পিতার শান মুবারকের খিলাফ কোন কথা বলা হয়নি বরং প্রশ্নকারীকে একটা আমল বলে দেয়া হয়েছে।

বর্ণনা নং ২ঃ
ছিহাহ ছিত্তার অন্যতম কিতাব ইবনে মাজাহ শরীফে ভিন্ন সনদে আরো একখানা হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে,
عَنْ سَالِـمٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَبِيْهِ، قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ أَبِيْ كَانَ يَصِلُ الرَّحِمَ، وَكَانَ وَكَانَ، فَأَيْنَ هُوَ؟ قَالَ فِي النَّارِ قَالَ: ‌فَكَأَنَّهٗ ‌وَجَدَ ‌مِنْ ‌ذٰلِكَ، فَـقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَيْنَ أَبُـوْكَ؟ فَـقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَيْـثُمَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ مُشْرِكٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ قَالَ: فَأَسْلَمَ الْأَعْرَابِيُّ بَعْدُ، وَقَالَ: لَقَدْ كَلَّفَنِيْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَـعَبًا، مَا مَرَرْتُ بِقَبْرِ كَافِرٍ إِلَّا بَشَّرْتُهُ بِالنَّارِ
অর্থ: হযরত সালিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একজন বেদুইন এসে প্রশ্ন করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। বর্তমানে তিনি কোথায়? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, জাহান্নামে। এতে লোকটি কিছুটা মর্মাহত হল। অতঃপর সে ব্যক্তি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার পিতা তিনি কোথায়? তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, তুমি যখন কোন মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। পরবর্তীতে লোকটি মুসলমান হয়ে গেল এবং বলল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন যখনই আমি কোন কাফিরের কবরের পাশ দিয়ে গমন করেছি তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিয়েছি। (ইবনে মাজাহ ১/৫০১: হাদীছ শরীফ নং ১৫৭৩)

এই বর্ণনাটি উল্লেখ করে হযরত আবুল আব্বাস শিহাবুদ্দীন আহমদ ইবনে আবু বকর ইবনে ইসমাঈল রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত ৮৪০ হিজরী) বলেন,
هٰذَا إِسْنَادٌ صَحِيْحٌ رِجَالُهٗ ثِقَاتٌ
এই বর্ণনাটির সনদ সহীহ, বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। (মিছবাহুস জুজাজাত ফি যাওয়াদ ইবনে মাজাহ ২/৪৩)

বর্ণনা নং ৩ঃ
আরো একটি সহীহ সনদে হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে,
عَنْ عَمِّهِ لَقِيْطِ بْنِ عَامِرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، أَنَّهٗ خَرَجَ وَافِدًا إِلٰى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ نُـهَيْكُ بْنُ عَاصِمِ بْنِ مَالِكِ بْنِ الْمُنْـتَفِقِ فَـقَالَ: قَدِمْنَا الْمَدِيْـنَةَ لِاِنْسِلَاخِ رَجَبٍ فَصَلَّيْـنَا مَعَهُ صَلَاةَ الْغَدَاةِ، فَـقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي النَّاسِ خَطِيْـبًا، فَذَكَرَ الْحَدِيْثَ إِلٰى أَنْ قَالَ: فَـقُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ ‌صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَلْ ‌أَحَدٌ ‌مِمَّنْ ‌مَضَى ‌مِنَّا ‌فِيْ ‌جَاهِلِيَّةٍ مِّنْ خَيْرٍ؟ فَـقَالَ رَجُلٌ مِنْ عَرَضِ قُـرَيْشٍ: إِنَّ أَبَاكَ الْمُنْـتَفِقَ فِي النَّارِ، فَكَأَنَّهٗ وَقَعَ حَرٌّ بَيْنَ جِلْدِ وَجْهِيْ وَلَحْمِيْ مِمَّا قَالَ لِأَبِيْ عَلَى رُؤُوسِ النَّاسِ، فَـهَمَمْتُ أَنْ أَقُـوْلَ: وَأَبُوْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ ثُمَّ نَظَرْتُ فَإِذَا الْأُخْرَى أَجْمَلُ فَـقُلْتُ: وَأَهْلُكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَـقَالَ: مَا أَتَـيْتَ عَلَيْهِ مِنْ قَـبْرِ قُـرَشِيٍّ أَوْ عَامِرِيٍّ مُشْرِكٍ فَـقُلْ: أَرْسَلَنِيْ إِلَيْكَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَبْشِرْ بِمَا يَسُوْءُكَ
হযরত লাকিত ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, একবার তিনি একটি প্রতিনিধি দলের সাথে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র দরবার শরীফে আসলেন। উনার সাথে তখন নুহাইক বিন আসিম বিন মালিক বিন মুন্তাফিক ছিলেন। তিনি বলেন আমরা রজব মাসে পবিত্র মদিনা শরীফে পৌঁছলাম। অতঃপর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ফজরের নামায পড়লাম। নামায শেষে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি লোকদের প্রতি খুতবা মুবারক দিতে দাঁড়ালেন। (অতঃপর বর্ণনাকারী হাদীছ শরীফের বাকী অংশ বর্ণনা করলেন) অবশেষে বলেন- তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের মধ্যে যারা জাহিলিয়াত যুগে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মধ্যে কোন ভাল লোক আছে কি? তখন কুরাইশ বংশীয় এক ব্যক্তি বলল, তোমার পিতা মুন্তাফিক জাহান্নামী। উপস্থিত জনতার সামনে আমার পিতা সম্বন্ধে এমন মন্তব্য করায় আমার চেহারায় আগুন ঝরতে লাগল, কারণ সে সবার সামনে আমার পিতার ব্যাপারে এমন কথা বলেছে।
আমি প্রায় বলে ফেলেছিলাম: আর আপনার পিতা, হে আল্লাহর রসূল ছলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?
কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম অন্যভাবে বলা উত্তম হবে। তাই আমি বললাম: আপনার পরিবার (আত্মীয়স্বজন) সম্পর্কে কী, হে আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?
তখন তিনি বললেন: তুমি যখনই কোনো কুরাইশি বা আমিরি মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে যাবে, তখন বলবে “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন; সুতরাং এমন কিছুর সুসংবাদ গ্রহণ কর যা তোমাকে কষ্ট দেবে।”(মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন ৪/৬০৫: হাদীছ শরীফ ৮৬৮৩)

এ হাদীছ শরীফখানা উল্লেখ করে ইমাম হাকীম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
هٰذَا حَدِيْثٌ جَامِعٌ فِي الْبَابِ صَحِيْحُ الْإِسْنَادِ، كُلُّهُمْ مَدَنِيُّـوْنَ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ
এই হাদীছ শরীফখানা এই অধ্যায়ে জমাকৃত সকল হাদীছ শরীফের চাইতে সহীহ সনদে বর্নিত। বর্ণনাকারীগণ সকলেই মদীনা শরীফের। যদিও বুখারী মুসলিম শরীফে তা বর্ণিত হয়নি। (মুস্তাদরাক আলান সহীহাইন ৪/৬০৫)

বর্ণনা নং ৪ঃ
ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন কিতাবে বিশুদ্ধ সনদে একটি হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেছেন,
فَـقَالَ رَجُلٌ شَابٌّ مِّنَ الْأَنْصَارِ لَمْ أَرَ رَجُلًا كَانَ أَكْثَـرَ سُؤَالًا لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَرَى أَبَـوَاكَ فِي النَّارِ فَـقَالَ: ‌مَا ‌سَأَلْتُـهُمَا ‌رَبِّيْ ‌فَـيُـعْطِيْنِيْ ‌فِيْهِمَا وَإِنِّيْ لَقَائِمٌ يَوْمَئِذٍ الْمَقَامَ الْمَحْمُوْدَ
অর্থ: হযরত ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, একদা এক আনসারী যুবক হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, (ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন তার চেয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অধিক প্রশ্ন করতে আর কাউকে দেখিনি) ইয়া রসূলাল্লাহ ইয়া হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কি মনে করেন, আপনার পিতা-মাতা জাহান্নামী? (নাউযুবিল্লাহ!) তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, আমি উনাদের বিষয়ে আমার মহান রব উনার নিকট যা চাইব আমাকে তাই দেয়া হবে। আর সেদিন আমি মাকামে মাহমূদে অবস্থান মুবারক করব। (মুস্তাদরাক আলাছ ছহীহাইন ২/৩৯৬: হাদীছ ৩৩৮৫)

এ পবিত্র হাদীছ শরীফখানা উল্লেখ করে ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
هٰذَا حَدِيْثٌ صَحِيْحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ
এই পবিত্র হাদীছ শরীফখানা সহীহ সনদে বর্ণিত যদি বুখারী মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়নি। (মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন ২/৩৯৬)

এই হাদীছ শরীফের মাধ্যমে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার পিতা মাতার সুমহান মর্যাদা মুবারক প্রকাশ করে দিলেন। স্পষ্টই বুঝিয়ে দিলেন সবোর্চ্চ মাকাম মুবারকে অবস্থান যিনি করছেন তিনি হচ্ছেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উনার সম্মানিত পিতা মাতা উনারাও সবোর্চ্চ মাকাম মুবারকেই অবস্থান করছেন। সুবহানাল্লাহ!

* আরো একটি সমর্থক বর্ণনা:
আমরা ১ম পর্বে দেখেছি হযরত হাম্মাদ বিন সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহির পরিবর্তে আরো শক্তিশালী রাবি হযরত মা’মার বিন রশিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত ছাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহির সূত্রে সঠিক মতনে পবিত্র হাদীছ শরীফ আছে। এখানে আমরা আরেকটি বর্ণনা দেখাবো যেখানে হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীছ শরীফখানা হচ্ছে-
أَخْبَـرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ مَعْمَرٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنِ الزُّهْرِيِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، ৃ. قَالَ: هَلَكَ أَبُـوْكَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَمَدْخَلُهُ النَّارُ، قَالَ: فَـغَضِبَ الْأَعْرَابِيُّ، وَقَالَ: فَأَيْنَ مَدْخَلُ أَبِيْكَ؟ فَـقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَيْثُ مَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ كَافِرٍ فَـبَشِّرْهُ بِالنَّارِ
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একজন বেদুইন এসে বললো, ......আমার পিতা কি জাহিলিয়াতে মৃত্যুবরণ করেছে? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, হ্যাঁ। এতে লোকটি কিছুটা মর্মাহত হল। অতঃপর সে ব্যক্তি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার সম্মানিত পিতা আলাইহিস সালাম তিনি কোথায়? তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, তুমি যখন কোন মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিবে। (দলীল: মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১০/৪৫৪, হাদীছ শরীফ ১৯৬৮৭)

এই বর্ণনার সনদ কিন্তু ভিন্ন। অনেক বলতে পারে এই সনদতো ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহির মুরসাল। ইমাম যুহরীর মুরসাল নিয়ে তো অভিযোগ আছে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো যায় যে, আমাদের উপরে উল্লেখিত ১নং বর্ণনায় হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে মুত্তাসিল সনদ আছে। যা নিম্নরূপ-
عَنِ الزُّهْرِيِّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ، عَنْ أَبِيْهِ

সূতরাং মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাকের বর্ণনায় হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহির মুরসাল কোন সমস্যা নয়। কারণ এখানে হযরত আব্দুর রাজ্জাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমাম হযরত মা’মার রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি হযরত যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেছেন। এই পর্যন্ত সবাই সিক্বাহ। আর ১ নং বর্ণনায় ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আমের ইবনে সা’দ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি উনার পিতা হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এখানে হযরত ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে হযরত হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা তায়ালা আনহু পর্যন্ত কোন ইরসাল নেই বরং মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত সেই সাথে সকল রাবী সিক্বাহ। সুতরাং এই বর্ননাও সহীহ।

আমরা উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখতে পেলাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামের সুমহান শান মুবারকের খিলাফ ‘মুসলিম শরীফে’ বর্ণিত বর্ণনাটি মাত্র একটি বিচ্ছিন্ন সনদে এসেছে। অথচ তার বিপরীতে ৫ জন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম থেকে বর্ণনা এসেছে যেখানে সেই আপত্তিকর কথাটির লেশমাত্রও নেই। ৫ জন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হচ্ছেন,
১) হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
২) হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৩) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৪) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
৫) হযরত লাকিত ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।

সূতরাং যেখানে এতগুলো বিশুদ্ধ সনদে হাদীছ শরীফ পাওয়ার পরও শেষ বয়সে স্মৃতিশক্তি হারানো ‘মুসলিম শরীফে’ হযরত হাম্মাদ ইবনে সালামা রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বিছিন্ন একটি বর্ণনাকে পুঁজি করে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান আলাইহিস সালামের শান মুবারকের খিলাফ কথা বলা চরম গোমরাহীর বা ভ্রষ্টতার অন্তর্ভূক্ত।

আর উছূল হচ্ছে,
وَالْحَدِيثُ الصَّحِيحُ إِذَا عَارَضَهُ أَدِلَّةٌ أُخْرَى هِيَ أَرْجَحُ مِنْهُ وَجَبَ تَأْوِيلُهُ وَتَـقْدِيمُ تِلْكَ الْأَدِلَّةِ عَلَيْهِ كَمَا هُوَ مُقَرَّرٌ فِي الْأُصُوْلِ
অর্থ: যখন কোন সহিহ হাদীছ শরীফের সাথে অন্য কোন দলিল সাংঘর্ষিক হয় তখন সে ক্ষেত্রে সহিহ হাদীছ শরীফকে প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। এটা উছূল সমূহের একটি নীতি। (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া ২/২৭৪)

সূতরাং ৫টি ছহীহ হাদীছ শরীফের মোকাবিলায় একটি বিচ্ছিন্ন মতের কোন ভিত্তিই থাকে না আর সর্বোপরি এটা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইজ্জত ও সম্মানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে বিষয়টা আরো ভিত্তিহীন হয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন