ইরান যুদ্ধ বুঝতে আপনাকে একটা বিষয় অবশ্যই ভালো করে বুঝতে হবে তা হলো পেট্রোডলার।
আপনি যখন পৃথিবীর যেকোন দেশ থেকে কোন পন্য কিনেন তখন আপনার লেনদেনের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ বিনা পরিশ্রমে তৃতীয় একটি দেশ লাভবান হয়। দেশটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ লেনদেন হচ্ছে ডলারে। আপনি যখন যে কোন দেশে বেড়াতে যান বাংলাদেশ থেকে টাকা দিয়ে ডলার কিনে সেই ডলার নিয়ে বিদেশে যান। এরপরে বিদেশে গিয়ে ডলার বিক্রি করে সেই দেশের কারেন্সি কিনেন। ক্রেডিট কার্ড যেমন ভিসা বা মাস্টার কার্ড সঙ্গে নেন। সেটাতেও এনডোর্স করে নেন ডলার। দুইটাই কিন্তু মার্কিন কোম্পানি। সব দিকেই আমেরিকার লাভ।
এটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাস্তবতা। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল চললো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সবাই যুদ্ধ করতেছে। সবাই মরিয়া হয়ে খুঁজতেছে হাতিয়ার গোলাবারুদ এবং অস্ত্র। মিত্রবাহিনী অর্থাৎ ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে হয় অস্ত্র, না হয় রসদ, না হয় কাঁচামাল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিক্রি করেছে কে? আমেরিকা। এই ব্যবসাটি কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকা করেছিলো। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে করেছিল অনেক বড় পরিসরে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে সরাসরি অংশ নেয়নি আমেরিকা। ব্যবসা কিন্তু প্রথম থেকেই ঠিকই করেছে। ট্যাংক, বিমান, গোলাবারুদ বিক্রি করেছে প্রচুর। কিন্তু বিনিময়ে পেমেন্ট হিসেবে নিয়েছে কি? স্বর্ণ অর্থাৎ গোল্ড। ইউরোপের দেশগুলো বিশেষ করে সে সময়ের পরাশক্তি ব্রিটেন তাদের স্বর্ণ ভান্ডার ঢেলে দিচ্ছিল আমেরিকার কাছে।
এদিকে ১৯৪১ সালে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু খেয়াল করুন আমেরিকার মূলভূমিতে কিন্তু কোন যুদ্ধ হয়নি। সেখানে কলকারখানা স্বাভাবিক গতিতে চলেছে। এবং যুদ্ধের শেষ দিকে দেখা গেলো পৃথিবীর মোট স্বর্ণের প্রায় ৭০% জমা হয়ে গেছে আমেরিকার কোষাগারে। ইউরোপ হয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপ আর আমেরিকা অক্ষত এবং অকল্পনীয় ধনী। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৪ সালে ঘটলো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আমেরিকার নিউ হ্যামশেয়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটনউড শহরে জড় হল ৪৪ টি দেশের প্রতিনিধি। লক্ষ্য একটাই যুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নির্ধারন করা। এখানেই জন্ম হলো ব্রেটনউড সিস্টেমের। ঠিক হলো অন্য দেশগুলোর কারেন্সি আমেরিকান ডলারের সাথে একটি নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জ রেটে বাঁধা থাকবে। আর আমেরিকার ডলার সরাসরি স্বর্ণের সাথে বাঁধা থাকবে। অর্থাৎ মার্কিন ডলার হবে গোল্ড ব্যাক কারেন্সি। ৩৫ মার্কিন ডলার হবে এক কাউন্স গোল্ডের সমান। ফলে পুরো পৃথিবীর মুদ্রা ব্যবস্থার মেরুদন্ড হয়ে গেল আমেরিকান ডলার।
কেন অন্য দেশগুলো রাজি হয়েছিল? কারণ তাদের কাছে কার্যত কোন বিকল্প ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা ইউরোপ ভেঙে পড়েছিলো। সে সময়কার সুপারপাওয়ার ব্রিটেন তখন কার্যত দেউলিয়া। হাতে কোন স্বর্ণের মজুদ নেই। ওদিকে আমেরিকার কাছে আছে স্বর্ণ, আছে মিলিটারি পাওয়ার। তাই আমেরিকার মুদ্রাকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হলো বাকি পৃথিবী।
ব্রেটনউড সিস্টেমে কোন দেশ জমানো ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ চাইলে আমেরিকা দিতে বাধ্য। মানে ডলার ছিল এক প্রকার স্বর্ণের রশিদ বা ভাউচার। আপনি ৩৫ ডলার পকেটে নিয়ে ঘুরতেছেন। মানে হলো আপনার পকেটে এক আউন্স গোল্ডের সমপরিমাণ সম্পদ আছে। এটাই ছিল ডলারের উপরে বিশ্বাসের ভিত্তি। কিন্তু এই ভরসা টিকে ছিল মাত্র ২৭ বছর। তাহলে ভরসা নষ্ট হলো কিভাবে? ১৯৫৫ সাল ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হল। চললো ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর। ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট টেকওভার ঠেকাতে আমেরিকা জান প্রাণ দিয়ে যুদ্ধে নামলো। অঢেল অর্থ ব্যয় করতে শুরু করল সেখানে। তখন মার্কিন সরকার আয়ের চেয়ে ব্যয় করছে বেশি। এই ব্যয় তাহলে কিভাবে মেটাচ্ছে? স্বর্ণ তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না। কিন্তু ডলার ডলার তো মার্কিন সেন্ট্রাল ব্যাংক অর্থাৎ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সম্পত্তি। মার্কিন সরকার চাচ্ছে আর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ইচ্ছামত ডলার ছাপিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ মার্কিন সরকার যুদ্ধের ব্যয় মেটাচ্ছে ডলার ছাপিয়ে। যে হারে ডলার ছাপানো হচ্ছে গোল্ডের মজুদ সেই হারে তো বাড়তেছে না। তাহলে কি হবে?
ধরুন কথার কথা আমেরিকার কাছে ১০০ আউন্স স্বর্ণ আছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩৫ ডলার সমান এক আউন্স গোল্ড। নিয়ম অনুযায়ী থাকার কথা সে হিসেবে ৩৫০০ ডলার। এখন মার্কিন সরকার যদি যুদ্ধের খরচ মেটাতে জোর করে আরো ৩৫০০ ডলার ছাপিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয় তাহলে কি হবে? স্বর্ণ কিন্তু সেই ১০০ আউন্স থাকলো। কিন্তু ডলার হয়ে গেল দ্বিগুণ। এর মানে কি? এর মানে হলো বাস্তবে ৩৫ ডলার আগের মত ওয়ান আউন্স স্বর্ণকে আর রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে না। ডলার তার ভ্যালু হারাবে। অথচ আমেরিকা তখনো দুনিয়াকে মিথ্যা গ্যারান্টি দিচ্ছে যে ডলার দিলেই নির্ধারিত রেটে স্বর্ণ পাবেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শালদ গোল বুঝলেন পরিস্থিতি। তিনি দেখলেন আমেরিকা যেভাবে ডলার ছাপাচ্ছে তাতে এই ব্রেটনউড সিস্টেম ভবিষ্যতে আমেরিকা আর রক্ষা করতে পারবে না। সুতরাং সময় থাকতে থাকতে ফ্রান্সের হাতে থাকা ডলারগুলো স্বর্ণে কনভার্ট করে ফেলাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ফ্রান্স প্রতিমাসে আমেরিকায় জাহাজ পাঠাতে লাগলো। জমানো ডলার রিটার্ন দিয়ে স্বর্ণ ফেরত নিতে শুরু করল। ফ্রান্সের দেখাদেখি জার্মানিও একই পথে হাঁটলো। আমেরিকার সোনার ভান্ডার দ্রুত কমতে লাগল। আমেরিকা দেখল অবস্থা খারাপ। মার্কিন ডলারের উপর থেকে খোদ ফ্রান্স এবং জার্মানির মত দেশের আস্থা হারিয়ে গেছে।
ডলার রিজার্ভ কারেন্সি হওয়াতে আমেরিকা একটা বিশেষ সুবিধা পায়। পণ্য আমদানি বাবদ যে পেমেন্ট সেটা সে ডলার ছাপিয়ে করে দিতে পারে। কিন্তু যদি আমেরিকাকে ডলারের বদলে ইউরোতে পেমেন্ট করতে হতো তাহলে কি হতো? তখন সে কি করতো? যেমন বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কেনে ডলারের বিনিময়ে এই ডলার আগে বাংলাদেশকে কিন্তু আয় করতে হয়। এরপর তো ব্যয় করে। কথার কথা যদি টাকা দিয়েই পেমেন্ট করা যেত তাহলে তো টাকা ছাপিয়ে ইচ্ছামত পেমেন্ট করে দেয়া সম্ভব হতো। কিন্তু টাকার পেমেন্ট করতে চাইলে কোন দেশ রাজি হবে না।
১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা করলেন আমেরিকা গোল্ড ব্যাক কারেন্সি থেকে সরে যাবে। ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় নিক্সন শক। এবার চিন্তা করুন বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর কথা যারা তাদের ফরেন রিজার্ভ রেখেছে মার্কিন ডলারে। রাতারাতি তারা এক নতুন বাস্তবতার সামনে এসে পড়ল। বিখ্যাত বিনিয়োগকারী রেডালিও সেই রাতের কথা তার বইতে লিখেছিলেন। সবাই ভেবেছিল আমেরিকার শেয়ার বাজার ধসে পড়বে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেয়ার বাজার উল্টো ৪% বেড়ে গেল। কিন্তু কেন?
ধরুন আপনি জানতে পারলেন ভয়াবহ ইনফ্লেশন হবে সামনে ১০০ টাকা ১০০ টাকাই থাকবে কিন্তু সেটার পারচেস পাওয়ার অর্ধেক হয়ে যাবে।
নিক্সন শকের পর আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছিল ডলার যেহেতু স্বর্ণের বাধন থেকে এখন মুক্ত সেহেতু মার্কিন সরকার এবার ইচ্ছামত কাগজে ডলার ছাপাবে। আগেও কিন্তু ছাপাচ্ছিলো। আর এখন তো কোন বাধাই নাই। আর যত বেশি ডলার ছাপাবে ডলারের মান তত কমবে। তাই তারা ক্যাশ ডলার হাতে না রেখে সেই ডলার দিয়ে হুরমুর করে মার্কিন কোম্পানির শেয়ার কেনা শুরু করল স্টক মার্কেটে গিয়ে। ফলাফল স্টক মার্কেট চাঙ্গা হয়ে গেল। এখন আমেরিকার ভেতরের মানুষ না হয় শেয়ার কিনলো। কিন্তু আমেরিকার বাইরে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ডে সারা পৃথিবীর দেশগুলো তো আর বোকা না। তারা ভাবলো যে ডলারের পেছনে কোন স্বর্ণের গ্যারান্টিই নেই সেই মূল্যহীন কাগজ আমরা কেন জমিয়ে রাখবো? কেন আমরা আমাদের পণ্য আমেরিকার কাছে বিক্রি করে পেমেন্ট হিসেবে কাগজের ডলার নেব? আর ঠিক এখানেই তৈরি হলো আমেরিকার জন্য এক জীবনমরণ সংকট। পৃথিবী যদি ডলার ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমেরিকার আর্থিক আধিপত্য তাশের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। সুতরাং যেকোন মূল্যে ডলারের চাহিদা ধরে রাখতে হবে। ডলারকে বাঁচাতে হবে। আর এই খাদের কিনারা থেকে ডলারকে বাঁচাতে আমেরিকা এক অবিশ্বাস্য চাল চাললো।
জন্ম নিল পেট্রোডলার সিস্টেম। আধুনিক সভ্যতার ব্লাড বা রক্ত হলো তেল। এই তেল ছাড়া আধুনিক সভ্যতা এক কদমই এগুতে পারবে না। আর এই তেলের ভান্ডার হলো মধ্যপ্রাচ্য। সালটি ছিল ১৯৭৩, অক্টোবর মাস। শুরু হলো আরব ইসরাইল যুদ্ধ। আমেরিকা সহ পশ্চিমা দেশগুলো ইসরাইলকে সমর্থন দিল। প্রচুর অস্ত্র পাঠালো। আর এতেই চরম ক্ষেপে গেল আরব বিশ্ব। তেল রপ্তানিকারক আরব দেশগুলো এক হয়ে ঘোষণা দিল আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধ। ফলাফল রাতারাতি বিশ্ববাজারে তেলের দাম চার গুণ হয়ে গেল। এক ব্যারেল তেলের দাম ১ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে এক লাফে বেড়ে হয়ে গেল ১২ ডলার। আমেরিকার রাস্তায় তেলের পাম্পে মাইলের পর মাইল গাড়ির লাইন তৈরি হলো। আমেরিকার অবস্থা তখন আসলেই নাজুক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিশাল খরচ মেটাতে গিয়ে মার্কিন সরকার এমনিতেই বিশাল বাজেট ঘাটতি নিয়ে চিন্তিত ছিল। আমেরিকার তৎকালীন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সাইমন বুঝতে পারলেন এই তেল সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু আমেরিকা নয় পুরো বিশ্বের ফাইনান্সিয়াল মার্কেট ধসে পড়বে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উইলিয়াম সাইমন একটি সরকারি বিমানে উঠলেন। গন্তব্য সৌদি আরব। উদ্দেশ্য স্পেশাল মিশন। গবেষক ডেভিড স্পিরো তার বিখ্যাত বই দ্যা হিডেন হ্যান্ড অফ আমেরিকান হেজিমনিতে তুলে ধরেছেন সেই সফরের বিবরণ। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল কি জানেন?
তেলের দাম কমানো মোটেই না। উদ্দেশ্য ছিল একদম ভিন্ন। যাকে বলা হয় দ্যা গ্রেটেস্ট ফাইনান্সিয়াল ডিল ইন হিস্ট্রি। সেই সময় সৌদি আরব শুধু একটা সাধারণ তেল উৎপাদনকারী দেশ ছিল না। তাদের কাছে ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভ এবং সবচেয়ে বেশি তেল উত্তোলনের ক্ষমতা। সৌদি আরব চাইলে একাই তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে সারা বিশ্বে তেলের দাম তলানিতে নামিয়ে দিতে পারতো। আবার উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে তেলের দাম বিশ্ববাজারে আকাশছোয়া করে দিতে পারতো। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কি হবে তার রিমোট কন্ট্রোল এক প্রকার পুরোটাই ছিল সৌদিদের হাতে। মিস্টার সাইমন সৌদি রাজপরিবারকে একটা অফার দিলেন। অফারটি ছিল আমেরিকা সৌদি আরবকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে। তাদের তেলের খনিগুলোকে পাহারা দেবে। শত্রু দেশের হাত থেকে তাদের রাজতন্ত্রকে রক্ষা করবে। তেলের দাম এবং প্রোডাকশন কন্ট্রোল করতে দেবে ফুল সাপোর্ট। কিন্তু বিনিময়ে সৌদি আরবকে করতে হবে দুটি কাজ। এক, তাদের তেল বিক্রি করতে হবে শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে, অন্য কোন মুদ্রায় নয়। দুই, তেল বিক্রি করে সৌদি আরব যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাভ করে সেই টাকা দিয়ে কিনতে হবে আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড। অর্থাৎ আমেরিকার টাকা বা মার্কিন ডলার ঘুরে ফিরে আবার আমেরিকাতেই ফেরত যাবে। আর পুরো দুনিয়া যখন তেল কিনতে যাবে তাদের বাধ্য হয়ে খুঁজতে হবে ডলার। তৈরি হবে ডলারের ভয়াবহ ডিমান্ড। এটাই হলো সেই বিখ্যাত পেট্রোডলার সিস্টেম। জন পারকিন্স তার দা কনফেশন অফ এন ইকোনমিক হিটম্যান বইতে তুলে ধরেছেন পুরো প্ল্যান। পার্কিংস তার বইতে পরিষ্কার লিখেছেন এই সত্যটা এমনভাবে দেয়া হয়েছিল সৌদি আরবের না বলার কোন অপশনই ছিল না। কারণ সৌদি আরব খুব ভালো করেই জানতো পশ্চিমাদের তেল স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিণতি কি ভয়াবহ হতে পারে। তারা চোখের সামনেই দেখেছিল তাদের প্রতিবেশী ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের কি করুণ পরিণতি হয়েছিল। সাধারণ নিয়মে দুনিয়ার যেকোনো দেশকে আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড কিনতে হলে পাবলিক নিলামে প্রতিযোগিতা করে কিনতে হয়। গবেষক ডেভিড স্পিরো তার বই দা হিডেন হ্যান্ড অফ আমেরিকান হেজিমনিতে নথিপত্র ঘেটে প্রমাণ করেছেন ১৯৭৪ সালে সাইমন সৌদি আরবের সাথে এক গোপন ডিল সাইন করে যার অফিশিয়াল নাম ছিল অডঅন আরেঞ্জমেন্ট। এই এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী সৌদি আরবের জন্য পুরো সিস্টেম চেঞ্জ করে ফেলা হয়। তারা সাধারণ নিলামের বাইরে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে সরাসরি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বন্ড কেনা শুরু করল। কিন্তু আমেরিকা কেন এই চুক্তিটা পৃথিবীর কাছে লুকিয়ে রেখেছিল? কারণ আমেরিকা তার নিজেদের মিত্র মানে ইউরোপ এবং জাপানকে কথা দিয়েছিল যে ওপেকের তেলের টাকা নিজেদের পকেটে টানতে কাউকে কোন স্পেশাল সুবিধা দেয়া হবে না। অথচ পর্দার অন্তরালে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশগুলোর পিঠেই ছুরি মেরেছিলো আমেরিকা। সৌদিদের তারা এমন এক একচেটিয়া সুবিধা দিচ্ছিল যা দুনিয়ার আর কোন দেশকে দেয়া হয়নি। এর কয়েক বছর পর পরবর্তী মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি মাইকেল ব্লুমেন্থাল করলেন আরেকটি সিক্রেট ডিল। এবার ওপেক গ্যারান্টি দিল পুরো বিশ্বের তেলের দাম এখন থেকে শুধু ডলারেই নির্ধারিত হবে। ব্যাস এই দুই গোপন চুক্তির উপর দাঁড়িয়েই জন্ম নিল পেট্রোডলার সিস্টেম। কি অবিশ্বাস্য একটা সিস্টেম। সৌদি আরব আর ওপেকভুক্ত দেশগুলো সারা দুনিয়ার কাছে তেল বেঁচে ডলার কামাচ্ছে। সেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে তারা কিনতেছে আমেরিকার সরকারি বন্ড। মানে আমেরিকার ডলার ঘুরে ফিরে আবার আমেরিকার পকেটেই ফিরে যাচ্ছে। সার্কেল কমপ্লিট মানে পুরাই ম্যাজিক। বিখ্যাত ইকোনমিস্ট মাইকেল হারডসন তার সুপার ইম্পেরিয়ালিজম বইতে দেখিয়েছেন ১৯৭১ সালে সেই নিক্সন শকের পর দুনিয়াতে এক অদ্ভুত সিস্টেম তৈরি হলো। কি সেই সিস্টেম? আমেরিকা যখন সংকটে পড়ে তারা কি করে? খুব সিম্পল। মেশিন চালিয়ে কারি ডলার ছাপায়। সেই ডলার যায় কোথায়? বিদেশী দেশগুলোর সেন্ট্রাল ব্যাংকের রিজার্ভে। আর সেই রিজার্ভের ডলার দিয়ে ওই দেশগুলো কি করে? আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডে ইনভেস্ট করে। দুনিয়ার নানান দেশের ফরেন রিজার্ভ আমেরিকাতেই থাকে। মার্কিন সরকার তাদের বাজেটের ঘাটতি মেটাচ্ছে। হারসন লিখেছেন, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জন কলানি ইউরোপিয়ানদের মুখের উপরে হেসে দিয়ে রসিকতা করে একবার বলেছিলেন 'ডলার ইজ আওয়ার কারেন্সি বাট ইট ইজ ইওর প্রবলেম'। এই পেট্রোডলার সিস্টেমের বাইরে যারাই যাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের উপরে বিপদ নেমে এসেছে জন পারকিন্স তার বইতে লিখেছেন যে কোন দেশে আমেরিকা প্রথমে পাঠায় যাদের তারা হলো ইকোনমিক হিটম্যান। খেয়াল করুন এরা সুট-টাই পড়ে হাতে ব্রিফকেস নিয়ে সেই দেশের নেতাদের কাছে যায়। বিশাল স্বপ্নের টোপ দেয়। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণের অফার আসে। স্বপ্ন দেখায় এই টাকায় মেগা মেগা প্রজেক্ট হবে। বড় বড় পাওয়ার প্লান্ট, ডিপ-সি পোর্ট, বিশাল হাইওয়ে এসব তৈরি হবে। নেতারা খুশিতে গদগদ। কিন্তু মেকানিজমটা দেখুন। ঋণ আসবে আমেরিকা থেকে। কিসের জন্য? মেগা প্রজেক্টের জন্য সেই মেগা প্রজেক্টের ঠিকাদার কারা? আমেরিকারই কর্পোরেশন ব্যাকটেল, হ্যালিবাটন স্টোন এন্ড ওয়েবস্টার অথবা তাদের মিত্র দেশের কোম্পানিগুলো।
মজার বিষয় হলো, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে দেয়া ঋণের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অনেক সময় আমেরিকার বর্ডারই ক্রস করবে না। কিভাবে? এক মার্কিন ব্যাংক থেকে বের হয়ে সরাসরি আরেক আমেরিকান কোম্পানির একাউন্টে ঢুকে যাবে। মাঝখান থেকে ওই গরীব দেশটা ফেসে যাবে পাহাড় সমান ঋণের দায়ে। আর যখন এই ঋণ শোধ করতে পারবে না তখন শুরু হবে প্ল্যান বি। মাঠে নামবে আইএমএফ। তারা বলবে ঋণের টাকা দিতে পারতেছো না। ঠিক আছে। তোমার দেশের সরকারি খাতগুলো প্রাইভেটাইজেশন করো। জনগণের ভর্তুকি কেটে দাও। শ্রম আইন শিথিল করো। সোজা কথায় দেশের জাতীয় সম্পদ পানির দামে বিদেশী কর্পোরেশনের কাছে বিক্রি করে দাও। আর যে নেতা এই বাটপারিতে রাজি হবে না তার জন্য অপেক্ষা করতেছে আমেরিকার প্ল্যান সি। তাদের মদদপুষ্ট গোপন বাহিনী হয় দেশে মিলিটারি কু ঘটাবে নয়তো ওই নেতার গাড়িতে বা বিমানে রহস্যজনকভাবে দুর্ঘটনা ঘটবে নেতা মারা যাবে। এভাবেই পেট্রো ডলার এবং ইকোনোমিক হিটম্যানের উপরে ভর করে আমেরিকা গড়ে তুলেছে এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
এত সাধের সম্রাজ্য ছেড়ে আমেরিকা সহজেই যেতে চাইবে? বর্তমান ইরান যুদ্ধে আমেরিকা এসে ফেঁসে গেছে। তারা চলে যেতে পারছে না, কারন একবার পেট্রোডলার সিস্টেম ভেঙে গেলে ডলার নামক কাগুজে নোটের কোন মূল্যই থাকবে না। কোন দেশ আর ডলারে লেনদেনে আগ্রহী বা সাহসী হবে না। বিনিয়োগ ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইরান বর্তমানে মার্কিনীদের এই আকাঙ্খাতে হস্তক্ষেপ করছে। পেট্রোডলারের মুখে চপেটাঘাত করেছে। আমেরিকাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বের হতে কিন্তু যে জালে আটকে গেছে বের হওয়ার সুযোগ নাই। পৃথিবীর কোন কারেন্সি সারাজীবন রাজত্ব করতে পারে নাই, ডলারও পারবে না। সে দিন হয়তো আমারা দেখতে পাবো।
0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন