রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মরক্কোর সাবতা অঞ্চলে রাজকীয়ভাবে সমগ্র দেশব্যাপী ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ইতিহাস

মরক্কোর সাবতা বা বর্তমানে সেউতা (Ceuta) অঞ্চলে রাজকীয়ভাবে সমগ্র দেশব্যাপী ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ইতিহাস:

একখানা বই যার নাম ‘ওয়্যারাক্বাতুন আন হাদ্বারাাতিল মারিনিয়্যীন’। মুহাম্মদ ইবন আবদুল হাদী আল-মানূনী এই ইতিহাস ভিত্তিক বইট লিখেন। তিনি ছিলেন মরক্কোর একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিলের বিশেষজ্ঞ এবং উৎসভিত্তিক গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষক। তিনি মিকনাসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ফাসের কারাওয়িয়্যীন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মরক্কোর ইতিহাস, ইসলামী সভ্যতা, পাণ্ডুলিপি ও গ্রন্থতালিকা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি শুধু মারিনী রাজবংশের রাজনৈতিক ইতিহাস নয়; বরং তাদের যুগের সভ্যতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণা।


মারিনী শাসনামল ছিল সেই যুগগুলোর একটি, যখন মাগরিব অঞ্চলে মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। সে বিষয়ে উক্ত গ্রন্থে বর্ণিত আছে,
وقد حدث - بعد هذا - أن انتصب أبو القاسم محمد العزفي أميرا على سبتة ، فكان من أعماله تحقيق دعوة والده، واحتفل - في هذه المدينة - بالمولد النبوي من أول «ربيع» بعد إمارته : عام 648هـ / 1250م»، حتى عام وفاته : 677هـ / 1279م، وهذا كتاب «البيان» المغرب يصف احتفال أبي القاسم العزفي بالمولد النبوي من أول عام امارته ويقول :
من مآثره العظام، قيامه بمولد النبي - عليه السلام - من هذا العام، فيطعم فيه أهل بلده ألوان الطعام، ويؤثر على أولادهم - ليلة يوم المولد السعيد - بالصرف الجديد من جملة الإحسان عليهم والإنعام، وذلك لأجل ما يطلقون المحاضر، والصنائع والحوانيت يمشون في الأزقة يصلون على النبي عليه السلام، وفي طول اليوم المذكور يسمع المسمعون الجميع أهل البلد مدح النبي عليه السلام، بالفرحوالسرور والإطعام للخاص والعام، جار ذلك على الدوام، في كل عام من الأعوام.
এরপর এমন ঘটনা ঘটল যে, আবুল কাসিম মুহাম্মদ আল-আজফী সেউতা/সাবতা এর আমির হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন। উনার কার্যাবলির মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর পিতার উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করা। আবুল কাসিম মুহাম্মদ আল-আজফী সাবতার আমির হওয়ার পর প্রথম রবীউল আউয়াল, ৬৪৮ হিজরি/১২৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই সেখানে পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন শুরু করেন এবং ৬৭৭ হিজরি/১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর বছর পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। আর এই ‘আল-বায়ান’ নামক মাগরিবের (মরক্কোর) গ্রন্থে আবুল কাসিম আল-আজাফীর শাসনামলের প্রথম বছর থেকেই পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,
উনার মহান কীর্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো এই বছর থেকেই হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে অনুষ্ঠান করা। এ উপলক্ষে তিনি উনার দেশের অধিবাসীদের বিভিন্ন প্রকারের খাবার খাওয়াতেন। আর পবিত্র মীলাদ দিবসের রজনীতে তিনি ছোট শিশুদের অনুগ্রহ ও দয়া হিসাবে জন্য নতুন মুদ্রা/অর্থ দান করতেন। এর কারণ হলো, তারা মক্তব, কারিগরদের কর্মশালা ও দোকানপাট থেকে বের হয়ে গলিপথে চলাফেরা করত এবং হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি দরূদ পাঠ করতের। আর উল্লিখিত দিনজুড়ে পাঠকগন সমগ্র শহরবাসীকে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উনার প্রশংসামূলক কবিতা/নাত শরীফ শোনাতেন। আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে এবং সাধারণ ও বিশেষ সকলকে খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে এ আয়োজন চলত। এ প্রথা প্রতি বছরই নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকত।” (ওয়্যারাক্বাতুন আন হাদ্বারাাতিল মারিনিয়্যীন ৫১৯ পৃষ্ঠা)
মধ্যযুগে সাবতা মুসলিম আন্দালুস (স্পেন) এবং মরক্কোর বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশের অধীনে একটি সমৃদ্ধশালী শহর ও বন্দর ছিল। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক উপকূলীয় শহর। ভৌগোলিকভাবে এটি মরক্কোর ভূখণ্ডের সাথে লেগে থাকলেও, এটি রাজনৈতিকভাবে স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এর একমাত্র স্থল সীমানা রয়েছে মরক্কোর সাথে। বাকি তিন দিকে রয়েছে ভূমধ্যসাগর।
প্রায় সমসাময়িক যুগে ইরিবেলের শাসক মালিক মুজাফফর আদ-দ্বীন কুকুবুরি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন। বোঝার বিষয় হচ্ছে ইরাকের ইরবিল আর সাবতার কিন্তু পাশাপাশি কোন দেশ নয়। বরং ইরবিল থেকে সাবতার দূরুত্ব আকাশ পথেই ৪৩৮৬ কিলোমিটার।


যারা বলেন, বাদশা মালিক মুজাফফর তিনি সর্বপ্রথম জাতীয়ভাবে পালন করেছেন তাদের হিসাবে কিছু ভুল আছে। ৪৩৮৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাগরঘেরা এক মুসলিম জনপদে একই যুগে বাদশা মালিক মুজাফফর রহমতুল্লাহি আলাইহির প্রভাব ছড়িয়ে পরবে সেটা সহজ নয়। মূলত সময়কালটা এমন ছিলো যে, ওই সময় সমগ্র পৃথিবীব্যাপী ব্যাপকভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালিত হতো।
কারন উক্ত বইয়ের ৫১৮ পৃষ্টায় আছে,
"إن يوم المولد النبوي كان يتخذ عطلة عامة بمكة المكرمة، وتفتح فيه الكعبة المشرفة ليؤمها الزوار ".
“মক্কা মুকাররমায় হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন্নবীর দিনকে একটি ছুটির দিন হিসেবে গণ্য করা হতো। আর সেদিন সম্মানিত কাবা শরীফ খুলে দেওয়া হতো, যাতে আগত দর্শনার্থীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারে।”
সূতরাং ঐতিহাসিকভাবে এটাই বোঝা যায় ভৌগলিক পরিমন্ডলে সমগ্র মুসলিম সালতানাতে একযোগে পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালিত হতো। আর সে সব মাহফিলে সে যুগের বড় বড় ইমাম, বুযূর্গ, ফক্বীহ, মুহাদ্দিছ, আলেম উপস্থিত থাকতেন। দেশবাসী সবাইকে নিয়ে উনারা অত্যান্ত জাঁকমকের সাথে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করতেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন