মিশরে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের ইতিহাস-
শায়খ জামালুদ্দীন আবুল মাহাসিন ইউসুফী ইবন তাগরী বারদী রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত: ৮৭৪ হিজরী) মিশরের ইতিহাস বিষয়ক সুবিশাল গ্রন্থ ‘আন নুজূমুয যাহিরাহ ফী মুলূকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ’র ১২তম খন্ড ৭২-৭৪ পৃষ্ঠাতে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের বিস্তারিত বর্ণণা প্রদান করেন,
وفى ليلة الجمعة ثانى شهر ربيع الأول عمل السلطان المولد النبوىّ على العادة فى كلّ سنة. قلت: نذكر صفة ما كان يعمل بالمولد قديما ليقتدى به من أراد تجديده فلمّا كان يوم الخميس المذكور، جلس السلطان بمخيّمه بالحوش السلطانى، وحضر القضاة والأمراء ومشايخ العلم والفقراء، فجلس الشيخ سراج الدين عمر البلقينى عن يمين السلطان، وتحته الشيخ برهان الدين إبراهيم بن زقّاعة، وجلس على يسار السلطان الشيخ المعتقد أبو عبد الله المغربى، ثم جلس القضاة يمينا وشمالا على مراتبهم، ثم حضر الأمراء فجلسوا على بعد من السلطان، والعساكر ميمنة وميسرة فقرأت الفقهاء، فلمّا فرغ القرّاء وكانوا عدّة جوق كثيرة، قام الوعاظ واحدا بعد واحد، وهو يدفع لكل منهم صرّة فيها أربعمائة درهم فضة، ومن كلّ أمير شقّة حرير خاصّ وعدّتهم عشرون واحدا.
وأنعم أيضا على القرّاء لكل جوقة بخمسمائة درهم فضة وكانوا أكثر من الوعّاظ، ثم مدّ سماط جليل يكون مقداره قدر عشرة أسمطة من الأسمطة الهائلة، فيه من الأطعمة الفاخرة ما يستحى من ذكره كثرة، بحيث إن بعض الفقراء أخذ صحنا فيه من خاصّ الأطعمة الفاخرة فوزن الصحن المذكور فزاد على ربع قنطار.
ولمّا انتهى السّماط «٢» مدّت أسمطة الحلوى من صدر المخيّم إلى آخره.
وعند فراغ ذلك مضى القضاة والأعيان وبقى السلطان فى خواصّه وعنده فقراء الزوايا والصوفية، فعند ذلك أقيم السّماع من بعد ثلث الليل إلى قريب الفجر وهو جالس عندهم ويده تملأ من الذهب، وتفرّغ لمن له رزق فيه والخازندار يأتيه بكيس بعد كيس، حتى قيل: إنّه فرّق فى الفقراء ومشايخ الزوايا والصوفية فى تلك الليلة أكثر من أربعة آلاف دينار.
هذا، والسّماط من الحلوى والفاكهة يتداول مدّة بين يديه، فتأكله المماليك والفقراء وتكرّر ذلك أكثر من عشرين مرّة.
ثم أصبح السلطان ففرّق فى مشايخ الزوايا القمح من الأهراء «١» لكل واحد بحسب حاله وقدر فقرائه، كلّ ذلك خارج عمّا كان لهم من الرواتب عليه فى كلّ سنة حسب ما يأتى ذكر ذلك فى آخر ترجمة الملك الظاهر بعد وفاته.
৮০০ হিজরি সনের রবীউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, বৃহস্পতিবারের রাতে, সুলতান আয যাহির বারকূক (ওফাত: ৮০১ হিজরী) প্রতি বছরের নিয়ম অনুযায়ী মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আয়োজন করেন। আমি এখানে পূর্বকালে মাওলিদের সময় কীভাবে আয়োজন করা হতো, তার পদ্ধতি উল্লেখ করছি যাতে যারা এ ধরনের আয়োজন করতে চায়, তারা এর অনুসরণ করতে পারে।
উল্লিখিত বৃহস্পতিবারের দিন সুলতান রাজকীয় প্রাঙ্গণের ‘হাওশ’-এ তাঁর শিবিরে বসেন। সেখানে কাজীগণ, আমীরগণ, আলেম-মাশায়েখ এবং ফকীরগণ উপস্থিত হন।
সুলতানের ডান পাশে বসেন শায়খ সিরাজুদ্দীন উমর আল-বুলকীনী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর নিচে বসেন শায়খ বুরহানুদ্দীন ইবরাহীম ইবন যাক্কাআহ।
সুলতানের বাম পাশে বসেন শায়খ আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবী, যিনি ‘আল-মু‘তাকাদ’ নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর কাজীগণ তাঁদের মর্যাদা ও পদ অনুযায়ী ডান ও বাম পাশে বসেন। তারপর আমীরগণ উপস্থিত হন এবং সুলতানের থেকে কিছুটা দূরে বসেন। সৈন্যবাহিনী ডান ও বাম পাশে অবস্থান নেয়।
এরপর ফকীহগণ কুরআন তিলাওয়াত করেন। যখন ক্বারীগণ তিলাওয়াত শেষ করলেন তাঁরা ছিলেন অনেকগুলো দল। তখন ওয়ায়েজগণ একের পর এক দাঁড়িয়ে ওয়াজ করতে থাকেন।
সুলতান প্রত্যেক ওয়ায়েজকে ৪০০ রৌপ্যমুদ্রা সম্বলিত একটি থলি প্রদান করতেন। আর প্রত্যেক আমীরের পক্ষ থেকে একটি করে বিশেষ কাপড়ের বস্ত্র দেওয়া হতো, এমন আমীরের সংখ্যা ছিল ২০ জন। তিনি ক্বারীদেরও পুরস্কৃত করেন, প্রত্যেক দলকে ৫০০ রৌপ্যমুদ্রা দেওয়া হয়। ক্বারীদের সংখ্যা ওয়ায়েজদের চেয়েও বেশি ছিল।
এরপর একটি বিরাট খাবারের দস্তরখান বিছানো হয়। এর পরিমাণ ছিল প্রায় দশটি বিশাল দস্তরখানের সমান। তাতে এত বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের ও মূল্যবান খাবার ছিল যে, তার আধিক্য বর্ণনা করতেও লজ্জা হয়। এমনকি একজন ফকীর সেই উৎকৃষ্ট খাবারের একটি থালা নিয়ে নেন। থালাটি ওজন করা হলে দেখা যায়, তার ওজন এক-চতুর্থাংশ ক্বিনতার-এরও বেশি।
যখন সেই খাবারের দস্তরখান শেষ হলো, তখন মিষ্টির দস্তরখানগুলো শিবিরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিছিয়ে দেওয়া হলো।
এরপর যখন এসব শেষ হলো, তখন কাজীগণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা চলে গেলেন। সুলতান তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ লোকজনের মধ্যে থেকে গেলেন। তাঁর কাছে ফকীর ও সুফিরাও ছিলেন।
তখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে প্রায় ফজর পর্যন্ত ‘সামা‘’ অনুষ্ঠিত হলো। সুলতান তাঁদের সঙ্গে বসে রইলেন। উনার হাতে সোনার মুদ্রা ভরা থাকত, যাদের জন্য এর মধ্যে নির্ধারিত প্রাপ্য ছিল, তাদের জন্য তিনি তা বের করে দিতেন। আর খাজানাদার একের পর এক থলে এনে দিচ্ছিল।
এমনকি বলা হয়েছে, সেই রাতে তিনি ফকীর, জাওয়িয়ার শায়খ ও সুফিদের মধ্যে চার হাজারেরও বেশি দিনার বিতরণ করেছিলেন।
এদিকে মিষ্টি ও ফলের দস্তরখান কিছু সময় পরপর উনার সামনে পরিবেশন করা হচ্ছিল। মামলুক ও ফকীররা তা খেত। এভাবে বিশবারেরও বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।
এরপর সকাল হলে সুলতান শায়খদের মধ্যে রাজকীয় খাদ্যভাণ্ডার থেকে গম বিতরণ করলেন। প্রত্যেককে তার অবস্থা এবং তার অধীনস্থ ফকীরদের সংখ্যা অনুযায়ী গম দেওয়া হলো।
এসব কিছুই ছিল তাঁদের জন্য সুলতানের পক্ষ থেকে প্রতি বছর যে নিয়মিত ভাতা নির্ধারিত ছিল, তার অতিরিক্ত। উনার ইন্তেকালের পর তাঁর জীবনীতে পরবর্তী অংশে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে।”
(আন নুজূমুয যাহিরাহ ফী মুলূকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ ১২তম খন্ড ৭২-৭৪ পৃষ্ঠা)
এই আয়োজনের কথা হাফিজুল হাদীছ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজে উনার কিতাবে বর্ণনা করেন, যা ইতিপূর্বে আমার পোষ্টে আলোচনা করেছি। আজকের এই বর্ণনায় কতাটা ব্যাপকভাবে পালিত হতো সে দলীল দেয়া হলো।
উপরোক্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো,
نذكر صفة ما كان يعمل بالمولد قديما ليقتدى به من أراد تجديده
‘আমি এখানে পূর্বকালে মাওলিদের সময় কীভাবে আয়োজন করা হতো, তার পদ্ধতি উল্লেখ করছি যাতে যারা এ ধরনের আয়োজন করতে চায়, তারা এর অনুসরণ করতে পারে।’
কতটা গুরুত্ব ও শান শওকতের সাথে পালিত হতো এক সময় চিন্তা ও ফিকির করে দেখেন। পৃথিবী বিখ্যাত আলেম উলামা, ফক্বীহগন সেখানে উপস্থিত থাকতেন। মানুষ যাতে পরবর্তীতে তেমন শান শওকত বাজায় রেখে পালন করতে পারে সে জন্য ইতিহাসের পাতায় তিনি লিখে গেলেন।







0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন