সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাব নিয়ে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র

হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান শান মান মুবারক সমৃদ্ধ একখানা বিখ্যাত কিতাব হচ্ছে “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী সাইয়্যিদি উইলদি আদম”। বাতিল ফিরক্বার লোকেরা এই নির্ভরযোগ্য কিতাব নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। মিথ্যা বানোয়াট কথা বলে সাধারণ মানুষদের এই কিতাব ও এর দলীলসমূহের বিষয়ে ভুল বোঝাচ্ছে।

পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ বা পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর লিখিত অন্যতম একটি কিতাব হচ্ছে “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী সাইয়্যিদি উইলদি আদাম”। লেখক হচ্ছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ, পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বিশিষ্ট মুফতী, অসংখ্য কিতাবের মুছান্নিফ হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহতুল্লাহি আলাইহি তিনি। উক্ত কিতাবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন সম্পর্কে হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম, হযরত তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম, মাযহাব উনার ইমাম ও বিখ্যাত অনেক আলিম উনাদের ক্বওল শরীফ বিদ্যমান রয়েছে। বিরোধিতাকারীদের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে এখানেই। কারণ এ কিতাবকে যদি মেনে নেয়া হয় তবে ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আর বিরোধিতা করার কোন অবকাশই থাকে না।
“নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাবটিকে জাল প্রমাণ করার জন্য মীলাদ শরীফ বিরোধি লোকেরা উঠে পরে লেগেছে। তারা এর জন্য ইবারত কারচুপী, জাল পান্ডুলিপী রচনাসহ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বই পুস্তক লিখছে। তেমনি একজন হচ্ছে তুরষ্কের আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ। এছাড়াও সৌদি আরবের আরো অনেক ওহাবী বিষয়টিতে সংযুক্ত হয়েছে। তারা প্রচার করছে মুহাদ্দিছ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাব লিখেননি বরং তিনি লিখেছেন “ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম”। এ মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ভয়ানক সব জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মীলাদ শরীফ বিষয়ে আরো একটি কিতাব লিখেছেন যার নাম হচ্ছে “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”। মীলাদ বিরোধি সম্প্রদায় প্রচার করছে এই “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবখানা হচ্ছে “ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাবের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৪৪১ হিজরী সালে আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ নামক জনৈক তুরস্কের ব্যক্তিটি “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবের তাহকীক লিখেছে এবং তার নাম দিয়েছে ‘মাওলুদে ইবনে হাজার মুখতাছারু মিন কিতাবি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলুদে সাইয়্যিদি উলদী আদম’। অর্থাৎ সে নিজ থেকেই ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছে ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাওলুদ নামক একটা কিতাব লিখেছেন যা ইতমামু নি’মাতুল কুবরার সংক্ষিপ্ত রূপ। আর এ জালিয়াতি ছাবিত করার জন্য সে যা করেছে তা দাজ্জালকেও হার মানায়।



আমাদের হাতে ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির “মাওলিদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” কিতাবের তিনটি হালেলেখা পাণ্ডুলীপি আছে। প্রতিটি নূসখাতেই ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির এই বক্তব্য রয়েছে,
كما جـمعت ذلك كتاب النعمة الكبري علي العالـم بـمولد سيد ولد ادم
অর্থ: ঐ সমস্ত বিষয়গুলো আমি একটি কিতাবে জমা করেছি যে কিতাবের আমি নাম রেখেছি “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম”।
অথচ আব্দুল ওয়াহাব হাওয়াশ ‘মাওলুদে ইবনে হাজার মুখতাছারু মিন কিতাবি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলুদে সাইয়্যিদি উলদী আদম’ কিতাবে এই ইবারতে খেয়ানত ও কারচুপি করে লিখেছে,
كما جـمعت ذلك كتاب إتمام النعمة الكبري علي العالـم بـمولد سيد ولد ادم
লক্ষ্য করুন, এখানে إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটি ঢুকানো হয়েছে। যা ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের কোন একটি পান্ডুলিপীতে নেই। তাহলে এটা কেন ঢুকানো হলো?



কারন খুবই পরিষ্কার। আমরা মীলাদ শরীফ বিষয়ে হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের যে দলীল পেশ করি তা হযরত ইবনে হাজার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম’ নামক কিতাবে রয়েছে। আর ইতমামু নি’মাতুল কুবরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কিতাব। যা হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামে জাল করা হয়েছে বলে প্রমাণিত (এ বিষয়ে সামনে দলীল ভিত্তিক লেখ হবে)। সূতরাং মীলাদ বিরোধিদের জাল করা কিতাবকে মূল কিতাব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটি লাগিয়ে ইবনে হাজার রহমতুল্লাহির নামে জালিয়াতি ও চুরি করে ধরা পড়েছে।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, إتمام ‘ইতমাম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে চুড়ান্ত, পরিপূর্ণ, পূর্ণকরন ইত্যাদি। কোন একজন লেখক যখন একটা কিতাব লিখবেন তখনি শুরুতেই কি চুড়ান্ত বা পরিপূর্ণ করে লেখার কোন কারন আছে? কিতাবাদি যারা বুঝেন তারা জানেন, একজন লেখক একটা কিতাব লেখার পর একটা সময় মনে করেন এই কিতাবে আরো কিছু দলীল সংযুক্ত করা দরকার তখন তিনি আগের কিতাবকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য ‘ইতমাম’ দিয়ে আরেকটা সংস্করন করেন। অথবা লেখক যদি চান আগের কিতাবের সংক্ষিপ্ত রূপ তৈরী করবেন তিনি তখন পরবর্তী একটা সময়ে গিয়ে মুখতাসার বা সংক্ষিপ্ত আকারে লিখেন। আর ক্ষেত্র বিশেষে এই কাজটাও স্বয়ং মূল লেখক করেন না বরং ভিন্ন কোন লেখক কাজটা করে থাকেন। শুরুতেই নতুন একটা কিতাবে ইতমাম লেখাটা হাস্যকর একটা বিষয়। আর হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ কাজটি করেনওনি তা শুরুতেই আমরা প্রমাণ করেছি।
তাহলে মীলাদ বিরোধী মতবাদের লোকেরা কেন এই কাজ করলো? ‘ইতমামু নি’মাতুল কুবরা’ কিতাব প্রচার করা এবং ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবে ইতমাম শব্দে ইবারত চুরি করে ঢোকানোর রহস্য কি?

রহস্য বুঝতে হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের ওই অংশের সম্পূর্ণ ইবারতখানা পড়লে বিষয়টা পানির মত পরিষ্কার বোঝা যাবে। ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির লিখিত ‘মাওলিদুন্নবী’ কিতাবের ২৫, ২৬ ও ২৭ পৃষ্ঠায় লিখেন,

من ذالك الا ماظهر عند حمله و قبيله ووقت ولادته وَفِيْ اَيَّامِ رَضَاعَتِه وَتَرْبِيَّتِه لكفي كَمَا جَـمَعْتُ ذٰلِكَ كِتَابَ "الِنعْمَةِ الْكُبْرٰي عَلَى الْعَالَـمِ بِـمَوْلِدِ سَيِّدِ وُلْدِ اٰدَمَ" بِاَسَانِيْدِه الَّتِيْ نَقَلَهَا اِئِمَّةُ السُّنَنِ وَاَحَدِيْثَ الْـمَوْصُوْفُوْنَ بِالْـحِفْظِ وَالْاِتْقَانِ وَالْـجَلَالَةِ وَالْبُرْهَانِ فِي الْقَدِيْـمِ وَالْـحَدِيْثِ مِـمَّا هُوَ سَالِـمٌ مِّنْ وَضْعِ الْوَضَاعِيْنَ وَاِنْتِحَالِ الْـمُلْحِدِيْنَ [وَالْـمُغْتَوِيْنَ] وَالْـمُفْتِرِيْنَ لَا كَاَكْثَرِ الْـمَوَالِيْدِ الَّتِيْ بِاَيْدِي النَّاسِ فَاِنَّ فِيْهَا كَثِرًا مِّنَ الْـمُوْضُوْعِ الْكَذِبِ الْـمُخْتَلِقِ الْـمَصْنُوْعِ لٰكِنَّ فِيْ ذٰلِكَ الْكِتَابِ بَسْط لَايُتَمَّ قِرَأَتُه فِىْ مَـجْلِسٍ وَاحِدٍ فَاخْتَصَرْتُه هُنَا بِـحَذْفِ اَسَانِيْدِه وَغَرَائِـبِه وَاقْتَصَرْتُ مِنْهُ عَلٰى مَا يُسَنِّدُه مُتَابِعاَوْ عَاضِد دَوْمَا لِلتَّسْهِيْلِ عَلَي الْـمَادِحِيْنَ
অর্থ : “হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার মহাসম্মানিত আম্মাজান আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র রেহেম শরীফে থাকা অবস্থায় যে মোজেজা প্রকাশিত হয়েছে, পবিত্র রেহেম শরীফে তাশরীফ নেয়ার পূর্বে, পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহনের সময়, দুধ মুবারক পান করার দিন সমূহে এবং প্রতিপালন মুবারক যে দিন সমূহে হয়েছেন সে সকল বিষয়ে সঠিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ঐ সমস্ত বিষয়গুলো আমি একটি কিতাবে জমা করেছি যে কিতাবের আমি নাম রেখেছি “আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম বি মাওলিদে সাইয়্যিদ উলদি আদম”।
সনদসহ সে বিষয়গুলো সুনান ও হাদীছ শরীফের ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগন বর্ণনা করেছেন। যেসকল ইমামগন পূর্ণ মুখস্তশক্তি, দক্ষতা, মর্যাদাসম্পন্ন এবং নতুন ও পুরতন দলীল উপস্থাপনার গুণে গুনান্বিত। উক্ত কিতাবের বর্ণনাসমূহ মনগড়া বানোয়াটিদের বানোয়াটি থেকে, পথভ্রষ্টদের চুরি করা এবং প্রতারকদেরও প্রতারনামূলক বর্ণনা থেকে মুক্ত। মীলাদ শরীফ সংক্রান্ত উক্ত কিতাবের বর্ণনাসমূহ ওইরকম নয় যা মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে কেননা নিশ্চয়ই সেগুলোর বর্ণনা অধিকাংশ বানোয়াট, মিথ্যা রচিত, কৃত্রিম।
কিন্তু (সুনান এবং হাদীছ শরীফের ইমামগনের বর্ণিত) ওই সমস্ত কিতাব ব্যাপক ও বিস্তৃত, যা এক মজলিসে পাঠ করে শেষ করা যায় না। তাই আমি উক্ত বর্ণনাসমূহ থেকে সনদ ও দূর্বোধ্য বিষয়সমূহ বাদ দিয়ে ওখানে (আমার ঐ কিতাব আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ) সংক্ষিপ্ত করলাম। যেগুলো অন্য বর্ণনার সাথে সাদৃশ্য ও সমর্থিত, যাতে প্রশংসাকারীগণ অতি সহজে সর্বদা আমল করতে পারেন।”
এ ইবরত থেকে কি প্রমাণ হলো? প্রমাণ হলো, হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাদীছ শরীফ সম্বলিত আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাবটি গ্রহন করলে প্রমাণ হয়ে যায় এ কিতাবে বর্ণিত সকল বর্ণনা গ্রহনযোগ্য সনদে প্রাপ্ত, এবং প্রশংশিত। আর এটাই মীলাদ বিরোধীদের গাত্রদাহের কারন। বিষয়টাকে বিতর্কিত করার জন্য তারা দুইটা কাজ করেছে-
১) ইতমামু নি’মামতুল কুবরা নামক জাল একটা কিতাব রচনা করেছে।
২) মাওলিদুন্নবী নামক কিতাবের ইবারত কারচুপি করে সেখানে ইতমাম প্রতিস্থাপন করেছে। নাউযুবিল্লাহ
এর অকাট্য প্রমাণ হচ্ছে দারু কুতুব ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত ‘ইতমামু নি’মাতুল কুবরার’ টীকাকারী যেকিনা পাক্কা মীলাদ শরীফ বিরোধী। ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার ভূমিকায় সে লিখেছে,
ومن البدع التي انتشرت في زماننا الاحتفال بمولد الرسول قلي الله عليه وسلم وغيره من الموالد، ولو كانت هذه الموالد لها علاقة بالدين لذكرها الله سبحانه في القرآن الكريم، أو لفعله الرسول صلي الله عليه وسلم أو أحد من أصحابه رضوان الله عليهم، وإنما هذا الامر لم يظهر في عهد رسول الله صلي الله عليه وسلم ولا في عهد أصحابه ولا في عصر التابعين وتابعيهم، وإنما كان أول من ابتدع تلك الموالد هم الفاطميون في القرن الرابع الهجري
আমাদের যুগে যে বিদআতগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তার মধ্যে একটি হলো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ এবং অন্যান্য মীলাদ (জন্মোৎসব)-এর উদযাপন । যদি এসব মীলাদের কোনো ধর্মীয় ভিত্তি থাকত, তাহলে তা মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফে উল্লেখ করতেন, অথবা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তা করতেন, কিংবা উনার কোনো ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম তা করতেন । অথচ হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের যুগে, এমনকি পরবর্তী তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের যুগেও এমন কিছু দেখা যায়নি । বরং এই ধরনের মীলাদ বা জন্মোৎসব সর্বপ্রথম চালু করেছিল ফাতেমীয় (শিয়া মতাবলম্বী) শাসকগোষ্ঠী, যারা চতুর্থ হিজরী শতকে এই বিদআতের সূচনা করে। (নাউযুবিল্লাহ)




উক্ত ভূমিকায় আরো লেখা আছে,
ومن ثم فإن عمل المولد من الامور المحدثة والبدع الضالة التي لا تمت إلي الاسلام،
"সুতরাং মীলাদ শরীফ উদযাপন একটি নব্যসৃষ্ট কাজ এবং পথভ্রষ্টকারী বিদআত, যার ইসলামের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।" (নাউযুবিল্লাহ)
আরেকটু সামনে অগ্রসর হয়ে ভূমিকাতে লেখা হয়েছে,
وهل الخلفاء الراشدون المأمور باتباع سنتهم، وهم أبو بكر وعمر وعشمان وعلي رضي الله عنهم اجمعين- سنوا الاحتفال بذكري مولد نبيهم صلي الله عليه وسلم؟ والجواب قطعا: لا، لا
আর সেই খলিফায়ে রাশিদীন যাদের সুন্নাহ অনুসরণ করার নির্দেশ রয়েছে তারা হলেন হযরত সিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম, হযরত ফারুকে আযম আলাইহিস সালাম, হযরত যুননুরাইন আলাইহিস সালাম, হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহি সালাম উনারা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিন পালন করার কোনো নিয়ম চালু করেছিলেন?
উত্তর নিশ্চিতভাবেই: না, কখনোই না। (নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ)


ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাব যে মূলত পবিত্র মীলাদ শরীফের পক্ষে লেখা হয়নি সেটা ভূমিকা থেকে দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত হলো। ইতমামু নিয়মাতুল কুবরা প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের জন্য বলা সহজ ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি মীলদ বিরোধী ছিলেন। সেটা হলে প্রকৃত নিয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম কিতাবটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে, মানুষ আস্থা হারাবে। খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের কওল শরীফ গুলোর প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারাবে।
এখন ইতমামু নি’মাতুল কুবরা যা হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামে লেখা হয়েছে সেটার কি হাকীকত?

একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে, চোর চুরি করলে কিছু আলামত রেখে যায়। ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবটা যে হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহির নামে জাল করা তার কিছু আলমত এই কিতাবের প্রথম ৪ লাইনেই পাওয়া গেছে। ইতমামু নি’মাতুল কুবরার ৪টি নুসখা পাশাপাশি রেখে প্রথম ৪ লাইনে ৭ টি ভুল পাওয়া যায়, যা এক নুসখার সাথে আরেক নুসখার ব্যাপক অমিল প্রমাণ করে। সেই সাথে এও প্রমাণ করে কারচুপি করতে গিয়ে কোন নুসখায় যে শব্দ আছে সেটা আরেক নুসখায় বাদ গেছে। কোনটাতে আবার বেশি কিছু ঢুকানো হয়েছে।
দারুল কুতব আল ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবের প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ আছে,
الفصل الاول في اصل عمل المولد اعلم انه لم ينقل عن احد من السلف من القرون الثلاثة التي شهد النبى صلى الله عليه وسلم بخيرتها، لكنها بدعة حسنة، لما اشتملت عليه من الاحسان الكثير للفقراء ومن قرأة القرآن اكثار الذكر والصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم واظهار السرور بمولده والفرح به صلى الله علیه وسلم




বাইতুল মোকাররমের বর্তমান খতীব আব্দুল মালেক নিজে পাণ্ডুলিপী প্রকাশ না করে কৌশলে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: উৎপত্তি, ভিত্তি ও আপত্তি’ নামক বইয়ের শেষে দারু কুতুবুল মিছরিয়ার যে পন্ডুলপিরি ছবি সংযুক্ত করেছে সেখানে যা উল্লেখ আছে,
الفصل الاول في اصل عمل المولد اعلم انه بدعة لانه لم ينقل عن احد من السلف من القرون الثلاثة التي شهد النبى صلى الله عليه وسلم بخيرتها لكنها بدعة حسنة لما اشتملت عليه من الاحسان الكثير للفقراء ومن قرأة القرآن اكثار الذكر والصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم واظهار السرور والفرح به صلى الله علیه وسلم
খুবই ভালো ভাবে খেয়াল করুন- এই নুসখায় اعلم انه এর পরে بدعة لانه শব্দটা ঢুকেছে যা দারু কুতুব আল ইলমিয়ার নুসখায় নেই। এরপর واظهار السرور এর পর দারু কুতুব আল ইলমিয়ার নুসখায় بمولده শব্দটি আছে অথচ দারু কুতুবুল মিছরিয়ার নুসখায় واظهار السرور শাব্দের পর بمولده বাদ দিয়ে দিয়েছে সেখানে শুধু السرور والفرح শব্দ লিখে দিয়েছে।


মিশর থেকে সংগৃহীত আরেকটি ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাবের ইবরাত জালিয়াতি করে এভাবে লেখা হয়েছে,
اظهار الفرح والسرور به صلى الله عليه وسلم والمحبة واغاظة اهل الزيغ والعناد
ভালো করে দেখুন , দারু কুতুব আল ইলমিয়া ও দারু কুতুবুল মিছরিয়া উভয় নুসখাতে اظهار শব্দের পর প্রথমে السرور লিখা আছে এর পর والفرح শব্দটি। অথচ মিশরের এই পান্ডুলপিীতে আগে والفرح শব্দটি লেখা আছে পরে السرور লিখা আছে। সেই সাথে اظهار الفرح والسرور به صلى الله عليه وسلم এই বাক্যের পর والمحبة শব্দটি যোগ করা হয়েছে যা আবার দারু কুতুব আল ইলমিয়া ও দারু কুতুবুল মিছরিয়ার কোন নুসখাতেই নেই।


আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর তার হাদীসের নামে জালিয়াতি বইয়ে মিশরের জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত পান্ডুলিপি নং ৪৪৯/ ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার দলীল দিয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে,
الفصل الأول في أصل عمل المولد. إعلم أنه بدعة لأنه لم ينقل عن أحد من السلف في القرون الثلاثة التي شهد النبي ﷺ بخيريتها؛ لكنها بدعة حسنة لما اشتملت عليه من الإحسان الكبير للفقراء ومن قراءة القرآن وإكثار الذكر والصلاة على النبي ﷺ..... إذا كان أهل الصليب اتخذوا ليلة مولد نبيهم عيدا أكبر فأهل الإسلام أولى بذلك وأجدر...


যা উপরের ৩ টা পান্ডুলিপির সাথেও মিলে না। আগের গুলাতে আছে من القرون الثلاثة আর এখানে আছে في القرون الثلاثة, আগের পান্ডুলিপিতে আছ الاحسان الكثير আর এখানে আছে الإحسان الكبير
কত আশ্চর্যের বিষয়! ৪ টি পান্ডুলিপীর মধ্যে মাত্র প্রথম ৪ টা লাইন লিখতে গিয়ে সাতটি কারচুপি করেছে। এ থেকে কি বোঝা যায়? কত কাঁচা হাতের চুরি। মূলত ইতমামু নি’মাতুল কুবরা কিতাব হযরত ইবনে হাজার হায়তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখেন নাই। এটা উনার নামে জাল করা হয়েছে ও প্রচার করা হচ্ছে মূলত নিয়মাতুল কুবরা আলাল আলামকে প্রশ্ন বিদ্ধ করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম, হযরত তাবেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও মাযহাবের ইমামগন উনারা যে পালন করেছেন সেটা ধামাচাপা দেয়া। তারা বিগত বেশ কয়েক বছর মূল নিয়মাতুল কুবরাকে জাল বানানোর জন্য উঠে পরে লেগেছিলো, অথচ আল্লাহ পাক তাদের মিথ্যা প্রচার পছন্দ করেন নাই। প্রমান হয়ে গেলো তাদের ইতমামু নিয়মাতুল কুবরাই মূলত জাল। এভাবেই সত্য মিথ্যার পার্থক্য চিরকাল হয়েছে, এখনো হলো।
বিঃদ্রঃ আমার কাছে জাল ইতমামু নিয়মাতুল কুবরার আরেকটা হস্তলিখিত পান্ডুলিপি আছে, মাঝখানে লেখালেখি থেকে দূরে থাকায় কোথায় রাখছি খুঁজে পাচ্ছি না। আছে কোথাও খুঁজে বের করতে হবে। সেখানেও আরো পার্থক্য আছে। প্রথম পৃষ্ঠার ৪ লাইনের মধ্যে এত ক্যাচাল সম্পূর্ণ বই মিলালে কি হবে ভেবে দেখেছেন? সে কাজও করবো ইনশাআল্লাহ।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন